খাদ্যাভ্যাস বদলে দিতে পারে জীবন
- এভারকেয়ার হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা

কিশোর থেকে প্রৌঢ় পর্যন্ত পুরুষের জীবনের সব ধাপে প্রভাব রাখে তার খাদ্যাভ্যাস। কিশোর বয়সে ছেলেদের শরীরে পেশি বা মাসল তৈরি হওয়ার যথাযথ সময়। এ সময়ে তাদের হাড়ের গঠন মজবুত হওয়া শুরু করে। এই বৃদ্ধির জন্য প্রথম দরকার পর্যাপ্ত প্রোটিন। শুধু প্রোটিনই নয়, পাশাপাশি ভিটামিন ‘ডি’ ও ক্যালসিয়ামের দিকে নজর দিতে হয়। সঠিক বয়সে এগুলোর জোগান না পেলে তাদের বাড়ন্ত শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই ১৮ বছর পার হওয়ার আগেই প্রতিটি ছেলেশিশুর খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রন ইত্যাদি নিশ্চিত করা জরুরি।
বদলে ফেলুন জীবনশৈলী
সন্তান ধারণের আগে আমরা সবসময় হবু মায়ের পুষ্টি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু হবু সন্তানের জন্য বাবার স্বাস্থ্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান ধারণের পরিকল্পনার সময় থেকেই ছেলেদের লাইফস্টাইল বদলে ফেলা ভালো। কারণ, আজকের অভ্যাসই নির্ধারণ করবে আপনার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ। এ সময় যা করবেন—
• বাইরের ভাজাপোড়া পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।
• রাত জেগে মোবাইল চালানো বন্ধ করা।
• দরকার পর্যাপ্ত ঘুম।
• প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত কিছুটা সময় হাঁটতে হবে।
• ধূমপান বা যেকোনো নেশাজাতীয় অভ্যাস থাকলে তা ছাড়তে হবে।
সুস্থ শরীরের জন্য চাই সুষম পুষ্টি
পুরুষের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন হলো টেস্টোস্টেরন। এটি ঠিকঠাক রাখতে হলে ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা চাই। বিএমআই ঠিক রাখা বা ওজন কমানোও জরুরি।
অফিসের ব্যস্ততায় অনেক পুরুষেরই নিয়ম করে ফল বা শাকসবজি খাওয়া হয়ে ওঠে না। এই অবহেলা থেকে শরীরে অনেক পুষ্টি ঘাটতি হয়। ফলে শরীর অলস, মনমেজাজ খিটখিটে হয়। তাই প্রতিদিনের খাবারে রঙিন শাকসবজি ও তাজা ফল রাখা চাই।
খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা জরুরি
প্রাপ্তবয়স্ক একজন চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী পুরুষকে সারা দিন প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকতে হয়। অনেকে আবার চাকরির পাশাপাশি ব্যবসাও সামলান। এই অতিরিক্ত খাটাখাটুনির ফলে শরীরে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’র ঘাটতি দেখা দেয়। আমাদের দেশের অনেক পুরুষেরই ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা আইবিএসের সমস্যা থাকে। তারা দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার হজম করতে পারেন না। এমন হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত। পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় ছোট মাছ, মাংস, ডিম ও বাদামের পরিমাণ বাড়াতে পারেন।
ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে ছেলেরা প্রায়ই দুপুরের খাবার বাইরে খেতে বাধ্য হয়। ফলে পেটে মেদ বা ভুঁড়ি জমে যায়। দেখা দেয় ফ্যাটি লিভার, হাইকোলেস্টেরল এবং ইউরিক অ্যাসিডের মতো গুরুতর সমস্যা। এই অস্বাস্থ্যকর খাবারই কিন্তু পরে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
মাসে ২৫ দিনই কাজের প্রয়োজনে বাইরে বেরোতে হয় ছেলেদের। এ সময় ঘরের খাবার সঙ্গে নেওয়ার অভ্যাস করা জরুরি। যদি খাবার নিতে একান্তই কষ্ট হয়, তবে সকালের দিকেই ভারী নাশতা হিসেবে ভাত, মাছ ও সবজি খেয়ে বের হতে হবে। আর সকালের হালকা নাশতা ব্যাগে বহন করা যেতে পারে।
সারা দিন বাইরে থাকার পর ছেলেরা রাতে বাড়ি ফেরেন। তখন পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসেন। কিন্তু রাতে একবারে প্রচুর খাবার খেয়ে ফেলা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া যাবে না। এতে হজমে ব্যাঘাত ঘটে এবং বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। ভুঁড়ি বাড়ার অনেক বড় একটি কারণ এটিই।
বড় সমস্যা হলো পানি কম খাওয়া। কাজের ফাঁকে পানির বদলে বারবার চা বা কফি খাওয়া ছেলেদের অনেকটা অভ্যাসের মতো। অতিরিক্ত ক্যাফেইনের ফলে রাতে ভালো ঘুম হয় না এবং ধীরে ধীরে হাইপ্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হয়। তাই চা-কফির কাপ সরিয়ে রেখে পানি পানের অভ্যাস করতে হবে।
দরকার প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং ও সচেতনতা
• বয়স যখন পঞ্চাশের কোঠায় পৌঁছায়, তখন শরীরের প্রতি যত্ন আরও বাড়াতে হয়। বয়স বাড়লে পুরুষেরও প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড বা রেক্টাম ক্যানসারের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো দরকার। পরিবারের কারও এসব রোগের ইতিহাস থাকলে স্ক্রিনিং খুব জরুরি।
• আজকাল অনেক ছেলের শরীরে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি দেখা যায়। বিশেষ করে পরিবারে যদি থ্যালাসেমিয়ার ইতিহাস থাকে, তবে রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি।
• এ বয়সে এসে হাড়ের জয়েন্ট ভালো রাখতে হবে। হুটহাট সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা না করে সমতলে হাঁটার অভ্যাস করুন। দাঁতের যত্ন নিন, যাতে সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার চিবিয়ে খাওয়া যায়। বয়স ৪০ পেরোলেই খাবারে ফ্যাট ও লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। পাতে অতিরিক্ত লবণ রাখা যাবে না।
• এ সময় লাল চালের ভাত ও লাল আটার রুটি খাওয়া শুরু করতে পারেন। খাবারে রাখুন বেশি বেশি আঁশযুক্ত উপাদান। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে মাল্টিভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট নিন।




