হৃদরোগ প্রতিরোধে চাই নিয়ন্ত্রিত জীবন

বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পুরুষ মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো হৃদরোগ। অনেকেই মনে করেন, বুকে প্রচণ্ড ব্যথা না হলে হার্টের সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই আলাদা। হার্টের রোগ দীর্ঘদিন নীরবে শরীরের গুরুতর ক্ষতি করতে থাকে। রক্তনালিতে ধীরে ধীরে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে সৃষ্টি হয় ব্লক। যখন এই ব্লক রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তখন বুকে প্রচণ্ড ব্যথা দেখা দেয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে হার্ট অ্যাটাক কিংবা হঠাৎ মৃত্যুও ঘটতে পারে। অথচ আমরা বাইরে থেকে দিব্যি সুস্থ মানুষটির মতো ঘুরে বেড়াই। বেকায়দায় না পড়লে ভেতরকার খবর কেউ রাখি না।
ঝুঁকিতে আছেন কারা
আসুন একটু মিলিয়ে নিই, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছি –
• ধূমপানের অভ্যাস থাকলে
• উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন থাকলে
• ডায়াবেটিসের রোগী হলে
• রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকলে
• ওজন বেশি হলে
• ভিসেরাল ফ্যাট বা পেটের চর্বি বেশি থাকলে
• অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলে
• দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মুখে থাকলে
• পরিবারে হার্টের রোগের ইতিহাস থাকলে
একটি মারাত্মক ভুল ও বৃদ্ধ বয়সের শ্বাসকষ্ট
বৃদ্ধ বয়সে হঠাৎ নতুন করে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া মানেই তা অবহেলা করা যাবে না। অনেক সময় বৃদ্ধ রোগীরা বুকে ব্যথার কথা বলতে পারেন না। তারা শুধু বলেন, একটু হাঁটলেই দম আটকে আসছে, ভীষণ হাঁপিয়ে উঠছেন। আমরা ভাবি এটা বয়সের কারণে হচ্ছে বা সাধারণ বক্ষব্যাধি। এ ভুল ধারণার কারণে রোগী অনেক সময় ভুল করে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বা পালমোনোলজিস্টের কাছে যান। কালক্ষেপণে বাড়ে দুর্গতি। যথাসময়ে শুরু করা যায় না সঠিক চিকিৎসা। মনে রাখবেন, বৃদ্ধ বয়সে নতুন শ্বাসকষ্ট বা একটু জোরে হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠা মানেই প্রথমে ধরে নিতে হবে এটি হার্টের সমস্যা। তখন দ্রুত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন।
রোগের রূপ দুটি: এসিএস ও সিসিএস
হার্টের এ অসুখকে আমরা মূলত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম গ্রুপটি হলো ক্রনিক করোনারি সিনড্রোম (সিসিএস)। যারা একটু জোরে হাঁটলে বা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলে বুকে ব্যথা অনুভব করেন। আবার একটু দাঁড়িয়ে রেস্ট নিলে বা জিভের নিচে স্প্রে দিলে ব্যথা কমে যায়। তাদের শরীরে হয়তো ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা ধূমপানের ইতিহাস আছে। এই গ্রুপটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, ঠিকমতো চিকিৎসা না করালে এই গ্রুপটি যেকোনো সময় দ্বিতীয় গ্রুপে রূপান্তর হতে পারে।
আর দ্বিতীয় গ্রুপটি হলো একিউট করোনারি সিনড্রোম (এসিএস)। এরা তীব্র এবং প্রচণ্ড বুকে ব্যথা নিয়ে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি হন। এটি একটি বড় মেডিকেল ইমারজেন্সি। এখানে প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান।
শরীরের আগাম সংকেত বুঝুন
হার্ট অ্যাটাক হওয়ার অনেক আগেই শরীর বিভিন্নভাবে সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করে। আমাদের কাজ হলো, নিজের শরীরের সে সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া।
• বুকে মাঝখানে চেপে ধরা
• বুক ভারী অনুভূতি হওয়া
• তীব্র জ্বালাপোড়া অনুভব করা
• হাঁটাহাঁটি বা সিঁড়ি ভাঙার সময় বুকব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্ট হওয়া
বুকব্যথা শুরু হওয়ার পর অনেক সময় বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে যেতে পারে। এ সময় সতর্ক হতে হবে। এর সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘাম হওয়া, তীব্র দুর্বলতা কিংবা মাথা ঘোরানোও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ। অনেক সময় শুধু শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিও হৃদরোগের একমাত্র লক্ষণ হতে পারে।
ভুল ধারণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা
একটি বিষয় আমাদের পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। সব বুকব্যথা যেমন হার্টের কারণে হয় না, তেমনি হার্টের সব সমস্যাও প্রচণ্ড বুকব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। তাই উপসর্গ থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা করা জরুরি।
• ইসিজি
• ইকোকার্ডিওগ্রাফি
• ট্রেডমিল টেস্ট বা ইটিটি
• প্রচণ্ড বুকে ব্যথা হলে ‘ট্রপোনিন আই’
সুস্থ হৃদয়ের সহজ উপায় কী
ঝুঁকি কমানো কিন্তু খুব কঠিন নয়। শুধু প্রয়োজন একটু সচেতনতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। সুস্থ হৃদয়ের জন্য মেনে চলুন কিছু নিয়ম—
• রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখুন
• ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করুন। একটি সিগারেটও নয়
• নিয়মিত হাঁটুন এবং হালকা ব্যায়াম করুন। অলসতা দূর করুন
• শরীরের বিএমআই বা ওজন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন
• অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া একবারে কমিয়ে দিন
• পর্যাপ্ত ঘুমান এবং মানসিক চাপ কমানোর জন্য নিজের প্রিয় কাজ বা শখের দিকে নজর দিন
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল




