জীবিত পিতার ‘মৃত্যুসনদ’ মিলেছে
শিক্ষাসনদ মিলবে কি

উখ্যাইওয়াং মারমা। অনেক লড়াই করে পৌঁছেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথই যেন খোলা নেই সামনে। তার জীবনের গল্প লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক ও মনু ইসলাম
চান্দাপাড়া। বান্দরবানের রুমা উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম। পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে সেখানে লুকিয়ে থাকে চরম দারিদ্র্যের নীরব কান্না। সেই গ্রামেই জন্ম উখ্যাইওয়াং মারমার। অভাবের সংসারে দুবেলা দুমুঠো ভাত আর নিজের বই-খাতা বুকে জড়িয়ে গ্রামের চান্দা হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা; এর বাইরে তার ছোট্ট পৃথিবীতে কোনো চাওয়া ছিল না। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠার পরই বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা। পঞ্চম শ্রেণির পর গ্রামে আর পড়ার সুযোগ নেই, যেতে হবে রুমা সদরে। কিন্তু বাসা ভাড়া, খাওয়া, পড়াশোনা— এত টাকা কোথায় পাবে উখ্যাইওয়াংয়ের হতদরিদ্র পরিবার?
২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল— টানা তিন বছর রুমা উপজাতীয় আবাসিকে ভর্তির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় সে। এরপর চট্টগ্রামের হোস্টেলগুলোতে দৌড়ঝাঁপ। কোথাও সুযোগ মিলছিল না। উপায়ান্তর না দেখে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় তার পরিবার। একজন মধ্যস্থতাকারী জানান, বাবার ‘মৃত্যুসনদ’ জোগাড় করতে পারলে এবং আঠারো হাজার টাকা দিলে সরকারি এতিমখানায় ভর্তির সুযোগ মিলতে পারে উখ্যাইওয়াংয়ের। একজন বাবার কাছে এর চেয়ে কঠিন শর্ত আর কী হতে পারে! যে বাবা প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে ছেলেকে বড় করছেন, তাকে আজ কাগজে-কলমে নিজেকে ‘মৃত’ বানাতে হবে!
সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কাছে উখ্যাইওয়াং বাবা আপ্রুসে মারমার কাছে নিজের ‘জীবিত’ পরিচয় তুচ্ছ হয়ে যায়। বিভিন্ন জনের কাছে হাত পেতে একটি জাল মৃত্যুসনদ জোগাড় করেন তিনি। ঘরের শেষ সম্বল জমানো ধান বিক্রি করে আঠারো হাজার টাকা তুলে দেন মধ্যস্থতাকারীর হাতে। বাবার এই বুকফাটা ত্যাগের বিনিময়ে ২০১৬ সালে উখ্যাইওয়াংয়ের ঠাঁই হয় চট্টগ্রামের ফরহাদাবাদের সরকারি শিশু পরিবারে।
এতিমখানার গণ্ডিতেই তার নতুন জীবন শুরু। চট্টগ্রামের ফরহাদাবাদ কোরানীয়া স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি এবং ফরহাদাবাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০২৩ সালে জিপিএ ৪.৬১ পেয়ে এসএসসি পাস করে সে। পরিবারেই একদিন এক বড় ভাইয়ের মুখে সে প্রথম শোনে জাদুকরী একটি শব্দ— ‘বিশ্ববিদ্যালয়’। বড় ভাইয়ের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সংগ্রাম আর স্বপ্নের গল্প শুনে তার ভেতরে এক অদম্য জেদ তৈরি হয়; সেও একদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে।
হাটহাজারী সরকারি কলেজ থেকে ২০২৫ সালে জিপিএ ৪.২৫ পেয়ে এইচএসসি পাসের পর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। কিন্তু পকেটে কানাকড়িও নেই। এবার এগিয়ে আসেন মা ক্রুইথুইপ্রু মারমা। এতদিন আগলে রাখা শেষ সম্বল সামান্য স্বর্ণের গয়নাটুকু বন্ধক রেখে ছেলেকে পাঠালেন চট্টগ্রামে। মায়ের এই নিঃস্ব হওয়ার গল্প বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ফ্রি কোচিংয়ে দীর্ঘ কয়েক মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি শুরু করেন উখ্যাইওয়াং। অশ্রু আর ঘামের বিনিময়ে অবশেষে ধরা দেয় সেই কাঙ্ক্ষিত সোনার হরিণ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান পাহাড়ের সেই ছোট্ট ছেলে। যাতায়াত খরচের কথা ভেবে তিনি ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (বিবিএ) প্রোগ্রামে।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত এক সুন্দর সমাপ্তি নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত এক সুন্দর সমাপ্তি নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। যে ছেলে এতগুলো বছর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে পা রেখেছেন, তার চোখে আজ আনন্দের বদলে ভর করেছে ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র আশঙ্কা। ধারদেনা করে মানুষের সাহায্যে কোনোমতে ভর্তি হতে পারলেও আগামী চার-পাঁচ বছর খরচ চালাবেন কীভাবে? ক্যাম্পাস থেকে শহরের দূরত্ব চব্বিশ কিলোমিটার। সেখানে গিয়ে টিউশনি করে টিকে থাকাও এক প্রকার অসম্ভব। যে বাবা নিজের অস্তিত্ব মুছে দিয়েছিলেন, যে মা শেষ সম্বলটুকু বন্ধক রেখেছিলেন, তাদের সন্তান আজ ক্যাম্পাসের ভিড়ে একাকী ভবিষ্যৎ হাতড়ে বেড়ান। এত বড় একটা লড়াই কি শুধু টাকার অভাবে মাঝপথেই থেমে যাবে?
উখ্যাইওয়াং হাল ছাড়তে নারাজ। পড়াশোনা শেষ করে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে, মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে চান তিনি। তাই সাহায্য চেয়ে হাত বাড়িয়েছেন সবার কাছে।
সাহায্য পাঠানোর মাধ্যম
বিকাশ/নগদ: 01600826724 01575387279
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
Ukhai Wong Marma
AC/NO: 3067348952275
Bangla Bank PLC
Routing No. 090030130
Bandarban Branch






