আড্ডাপুরে ঢাকার চার শতক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চারশ বছর আগে সুবেদার ইসলাম খানের হাত ধরে রাজধানী হওয়া ঢাকা যুগে যুগে বদলালেও বদলায়নি এখানকার প্রাণোচ্ছল আড্ডার সংস্কৃতি। কালের বিবর্তনে বিনোদনের রাজকীয় দরবার কিংবা মোড়ের চায়ের দোকান স্থান বদলেছে সত্য, তবে হারায়নি ঢাকাবাসীর আড্ডার আবেগ। ইতিহাসের পাতা থেকে ঢাকার সেই ঐতিহ্যবাহী বিনোদন ও আড্ডা সংস্কৃতির গল্প তুলে ধরেছেন গোবিন্দ শীল
আড্ডা, বিনোদন, আমোদ-প্রমোদ বা মনোরঞ্জন যেভাবেই আমরা বিষয়টি বর্ণনা করি, একটি প্রসঙ্গে আমরা কেউই দ্বিমত পোষণ করতে পারব না যে, এটি আমাদের দেহ ও মনের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। তাই, প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা থেকে শুরু করে আজ আধুনিক যুগেও মনকে আনন্দিত রাখার নতুন নতুন উপায় খুঁজে চলেছে মানবসমাজ।
ঢাকা পত্তনের আগেও এ অঞ্চলে নানারকম আমোদ-প্রমোদের রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। ১৬১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এ অঞ্চলকে সুবা বাংলার রাজধানী ঘোষণা করে ঢাকার পত্তন করেন মুঘল সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর’।
ঢাকার নবাবরা ছিলেন বড়ই আমুদে স্বভাবের। তাদের আড্ডা ছিল মূলত দুই ধরনের। এর মধ্যে একটি হলো আহসান মনজিলের দরবারে হওয়া আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আড্ডা আর অন্যটি ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার আসর। এ আড্ডাগুলো সাধারণ মানুষের আড্ডা থেকে ছিল অনেকটাই আলাদা। বলা চলে অভিজাত, জাঁকজমকপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। রাজনীতির পাশাপাশি, নবাবরা সাহিত্য, গান-বাজনা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। এ আড্ডায় মুঘল, ব্রিটিশ ও স্থানীয় বাংলার সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটত, যা এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করত।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী তার পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থে আড্ডাবিষয়ক প্রবন্ধে বলছেন, “সিন্ধুর ‘পাল্লা’ মাছ, নর্মদার ‘মদার’ মাছ এবং পদ্মার ‘ইলিশ’ মাছ এক হলেও রান্নার ধরন ভিন্ন। তেমনি, আড্ডা বিশ্বজুড়ে থাকলেও, বাঙালির মতো তা রসিয়ে উপভোগ করার ক্ষমতা অন্য কারও নেই।” বলাবাহুল্য, মুজতবা আলী মিসরের কায়রোর আড্ডা, ফরাসিদের আড্ডা ও বাঙালিদের আড্ডা নিয়ে লিখে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন। বিদেশে থাকাকালে কায়রোর ‘কাফে দ্য নাইল’-এ মুজতবা আলীর নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
এই বাংলায় তো প্রবাদই আছে— ‘চায়ের কাপে ঝড় তুলে’ গল্প চালিয়ে যেতেন আড্ডাবাজরা!
চারশ বছরের পুরনো এ শহরের বিনোদনের এক বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে। মুঘল আমলের আগেও ঢাকায় মোরগ লড়াই, ষোলঘুঁটি, নানারকম মেলা, পৌষ-পার্বণ, নৌকাবাইচ, সুফি ও বৈষ্ণবী গান, কাওয়ালি, শারীরিক কসরত ও আরও কিছু খেলাধুলার প্রচলন ছিল। তবে নবাবদের সময়ে গান-বাজনা ও আসরকেন্দ্রিক বিনোদনের মাত্রা ছিল বাড়ন্ত। ইতিহাসে দেখা যায়, নবাবরা নাচ-গানের বিষয়ে অত্যন্ত সমঝদার ছিলেন। সে সময় লক্ষ্ণৌ থেকে নতর্কীরা (কাঞ্চনী) আসতেন বাংলায়। কারণ, নবাবরা তাদের অনেক মাসোহারা দিতেন। আর সাধারণ মানুষও রাগসংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। অন্তত ১ হাজার ২০০ জন কাঞ্চনী পুরান ঢাকায় সারা বছর অবস্থান করতেন, যারা মাসিক বেতনভুক ছিলেন বলে জানা যায়। ইতিহাসবিদ হাকিম হাবিবুর রহমান তার ‘ঢাকা পঞ্চাশ বছর আগে’ (ঢাকা পাচাশ্ বারস্ পাহেলে) বইটিতে লিখেছেন, নবাবপুরে নবাববাড়ির বাইরেও অনেক বৈঠকখানা ছিল যেগুলোতে সাধারণ মানুষেরও প্রবেশাধিকার ছিল। তিনি বলছেন: ‘এটা ওই সময়ের কথা যখন সব হিন্দুস্তানের নামিদামি গায়ক, রবাব (বিশেষ বীণা বাদক) এবং সেতার বাদক মর্যাদা লাভের আশায় এখানে বারবার আসতেন, বছরের পর বছর এখানে থাকতেন এবং ঢাকার অনুরাগী হয়ে পড়তেন যে, মিঠঠুন খান— সে সময়কার লক্ষ্ণৌ-এর বিখ্যাত গায়ক— এর মতো ব্যক্তি সারা জীবনের জন্য ঢাকাতেই থেকে গিয়েছিলেন।’
আমরা জানি যে, ব্রিটিশ শাসকরা বিনে পয়সায় বাঙালিদের মধ্যে চা বিতরণ করতেন যাতে করে পরবর্তী সময় এ পানীয়টি একটি লোভনীয় বাণিজ্যে পরিণত হয়। ঢাকাই খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতি বইয়ে সাদ উর রহমান জানাচ্ছেন, ১৯১৫ সালে কলকাতায় চায়ের দোকান ছিল ৪৪৪টি, যা পরের বছর শেষ নাগাদ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২৪টিতে। এই বাংলায় তো প্রবাদই আছে— ‘চায়ের কাপে ঝড় তুলে’ গল্প চালিয়ে যেতেন আড্ডাবাজরা! সে সময় চা ও হুক্কার ব্যবহার ছিল ব্যাপক। ঢাকায় কাশ্মীরি চায়ের প্রচলন সম্পর্কে হাকিম হাবিবুর রহমান বলছেন: “বিশেষত নিমকিন (নোনতা) কাশ্মীরি চা-এর স্বাদই ছিল আশ্চর্য ধরনের। এক ধরনের চা বিয়েশাদিতে পান করানো হতো, যাকে ‘গোলাম্নেবাদ’ বলা হতো। সঠিক শব্দ সম্ভবত হচ্ছে ‘গোলাব বানাত’, মূলত এটি ছিল শরবত, যা বিবাহের মাহফিলে পান করানো হতো।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। ক্যান্টিনটি যে ভবনে ছিল, তা আগে নবাবদের দরবার হল ও স্কেটিং রিংক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সময়ের বিবর্তনে এ অভিজাত স্থানটিই হয়ে ওঠে সাধারণ ছাত্র-শিক্ষকের আড্ডার কেন্দ্র, যা পরবর্তীকালে বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের সাক্ষী হয়ে আছে।
উদীয়মান রাজনীতিক, লেখক, পটুয়া সবারই বিস্তর আনাগোনা ছিল মধুর ক্যান্টিনে। শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, কবি বুদ্ধদেব বসু, শিল্পী জয়নুল আবেদিন, সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, ফতেহ লোহানী, সিকান্দার আবু জাফরের মতো ব্যক্তিরা এখানে নিয়মিত আসতেন। দর্শন, সাহিত্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে এখানে তর্ক-বিতর্ক হতো এবং ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালের প্রতিটি বড় আন্দোলনের পরিকল্পনার সূত্রপাত হয়েছিল এই ক্যান্টিনের টেবিলেই।
আগে যেসব স্থানে আড্ডা হতো, এখন নানা কারণে তা পরিবর্তিত হয়েছে। আগে চৌরাস্তার মোড়ে চায়ের দোকান, স্টেশনের চায়ের দোকান, ক্লাব ঘর, পুরনো দিনে খেয়াঘাট, রেস্তোরাঁ, সিনেমা হলের আশপাশে, স্টেশনের বুকস্টলে আড্ডা জমে উঠত। এ ছাড়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার ও দেশি কেরু কোম্পানির পানীয় বিক্রয়ের ঘুপড়ি (ছোট কুঁড়েঘর), অনুমোদনবিহীন আরও কিছু স্থান আমোদ-ফুর্তির বা বিনোদনের জন্য জনপ্রিয় ছিল। পুরনো দিনে হোমিও ডাক্তারখানা, ধনী ব্যক্তির বৈঠকঘর ইত্যাদি ছিল আড্ডা দেওয়ার মোক্ষম স্থান। এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খোলা নাটমঞ্চ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্র, ফেব্রুয়ারি মাসের বইমেলা, শীতকালীন গানের আসর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর, মধুদার ক্যান্টিন, শিল্পকলা একাডেমি, বেঙ্গল শিল্পালয় এবং দৃক গ্যালারি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণু আড্ডার অন্যতম স্থান দখল করে আছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিলিয়ার্ড ও বোলিং ক্লাব, যেখানে তরুণ প্রজন্ম বিশেষত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা বেশি।






