এখনো চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন আবু সাঈদ

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
মেডিকেল কলেজের চাকরি থেকে অবসর নিলেও প্রফেসর মোহাম্মদ আবু সাঈদ যুক্ত আছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায়। কাজ করছেন শিশু-কিশোর আন্দোলন ‘খেলাঘর’-এর সঙ্গে। লিখেছেন সৈয়দ ফরহাদ
প্রফেসর মোহাম্মদ আবু সাঈদের গল্পের শুরুটা মুর্শিদাবাদে। তারপর রাজশাহী। তারও পরে, অনেকটা সময় তার কাটল ময়মনসিংহে। ছোটবেলার পৃথিবী ছিল মাটির ঘর, বাড়িতে কৃষকের আনাগোনা, আর ভূস্বামী বাবার কড়া নজরদারি। জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালের ৬ জুন। ৮০ ছুঁইছুঁই জীবনে, পেছন ফিরে যখন তাকান, তখন মনে হয়— তার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার রইস উদ্দিন।
রইস উদ্দিন তার কাছে শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন একজন দার্শনিক। তিনি প্রায়ই সক্রেটিসের কথা বলতেন। ছোট্ট আবু সাঈদ সেসব মুগ্ধ হয়ে শুনত—
‘জ্ঞানের শুরুটা হয় প্রশ্ন দিয়ে।’
স্যার বুঝিয়েছিলেন, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যারা মনে করে তারা সব জানে অথচ প্রকৃত জ্ঞান শুরু নিজের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করেই।
সেই শিক্ষাই হয়তো প্রফেসর আবু সাঈদকে একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
একটি ঘটনা আজও তাকে ভাবিয়ে তোলে।
গ্রামের এক কৃষক চাচা একবার বাড়িতে এসে মাটিতে বসে পড়লেন। মা পরে বলেছিলেন, বেঞ্চে বসার নাকি নিয়ম নেই। কিন্তু নিয়মটা বানাল কে?
এসএসসি পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে। সেখান থেকে পাস করে ১৯৬৭ সালে ভর্তি হলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। মেডিকেলের জীবন ছিল কঠিন সংগ্রামের। দেশভাগের নির্মম বাস্তবতায় তাদের পরিবার তখন নিঃস্ব প্রায়। টাকা নেই, বই নেই, হোস্টেলের মেসে প্রায়ই খাবার জোটে না।
কিন্তু হাল ছাড়তেন না আবু সাইদ। ততদিনে দারিদ্র্য আর দেশভাগের বিজ্ঞান তার নখদর্পণে। পাঠ নিয়েছেন বাম রাজনীতির।
তবে সেসময় তার সহপাঠী আখতার বানু পাশে না থাকলে জীবনটা সত্যিই আরও কঠিন হয়ে যেত। ফাইনাল ইয়ারে থাকতেই তার শিক্ষক ওয়ালিউল্লাহ স্যার তাকে গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডায়াবেটিসের কাট-অফ পয়েন্টকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশের মানুষের জন্য ডায়াবেটিসের কাট-অফ পয়েন্ট নির্ধারণ করেন ৬। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তার এ গবেষণাকে দেয় স্বীকৃতি
এর মধ্যে ঘটে গেল আরেক ঘটনা। তার সেই সহপাঠিনী— ডা. বানু, যিনি একই সঙ্গে একজন অ্যাথলেট এবং মেধাবী ছাত্রী, দরিদ্র মেডিকেল ছাত্র আবু সাঈদকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। আবু সাঈদের বাবা অধ্যাপক ওয়ালিউল্লাহর সঙ্গে আলোচনা করে সম্মতি দিলেন।
বিয়ের পর দুজনই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে হালুয়াঘাট রুরাল হেলথ কমপ্লেক্সে বদলি হলেন ডা. আবু সাঈদ।
তখন বাংলাদেশ সদ্য স্বাধীন দেশ। চিকিৎসা ব্যবস্থা ভীষণ সীমিত। তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন ‘স্যাংস্টেকেন টিউব’-এর অভাব। একদিন এক কিশোর এলো তার মাকে নিয়ে। বয়স তেরো-চৌদ্দ বছর। লিভার ফেইল করে মা অচেতন। ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সাধারণ নিয়মে এই রোগীর চিকিৎসা করা প্রায় অসম্ভব। কারণ স্যাংস্টেকেন টিউব নেই। তিনি রাইলস টিউব ব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন।
এই সিদ্ধান্তে হাসপাতালের নার্স পর্যন্ত চমকে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত রোগীটি বেঁচে যায়।
তিনি দাবি করলেন, স্যাংস্টেকেন টিউব ছাড়া বাংলাদেশে এ ধরনের চিকিৎসা সেটিই ছিল প্রথম।
১৯৮২ সালে যোগ দেন বারডেমে। আর সেখানেই শুরু হয় তার আরেক বড় লড়াই। ডায়াবেটিসের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার লড়াই।
তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অনুযায়ী, আট ঘণ্টা উপবাসের পর ডায়াবেটিসের কাট-অফ পয়েন্ট ৭ দশমিক ৮ হলে ডায়াবেটিস ধরা হতো। কিন্তু আবু সাঈদ এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করলেন। তার এই চ্যালেঞ্জ একসময় রূপ নিল গবেষণায়। তার গবেষণার ফল দেখাল— বাংলাদেশের মানুষের জন্য ডায়াবেটিসের কাট-অফ পয়েন্ট হবে ৬। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তার এ গবেষণাকে দিল স্বীকৃতি।
বর্তমানে তার তিনটি গবেষণা চলছে। একটি হলো ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত শিশুদের ফ্যাটি লিভার নিয়ে, আরেকটি গ্রামীণ নারীদের মধ্যে সারভিকাল ক্যানসার ও ব্রেস্ট ক্যানসার কী পরিমাণে আছে, তা নিয়ে এবং অন্যটি করোনারি হার্ট ডিজিজ নিয়ে।
২০০০ সালের গোড়ায় তিনি শিশু-কিশোর আন্দোলন খেলাঘরের সঙ্গে যুক্ত হলেন। ময়মনসিংহের নান্দাইলে শুরু করলেন খেলাঘর সংগঠিত করার কাজ। একই সময়ে পাবনার সাঁথিয়ার ভুলবাড়িয়া গ্রামে, যেখানে তার বর্তমান পৈতৃক ঠিকানা, সেখানে গড়ে তুললেন ‘ইছামতী খেলাঘর’। আর এ কাজ করতে গিয়ে প্রথম বাধাটি পেলেন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্যদের কাছ থেকে। প্রভাতফেরি, গান, নাটক— মোটকথা সংস্কৃতিচর্চায় যাদের ঘোর আপত্তি। সেসব আপত্তি তিনি আমলে নেননি। শুধু নিজে নন,পরিবার ও পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে নিয়ে খেলাঘর গড়ার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে।




