রুনা লায়লার সাক্ষাৎকার
‘কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়’

রুনা লায়লা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
গানে গানে ৬২ বছর পেরিয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। সম্প্রতি ভারতে মিনার-এ-দিল্লি সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। নতুন বাংলা গজল, ঈদ অনুষ্ঠান, কনসার্টসহ বেশ ব্যস্ত সময় কাটছে তার।
নতুন বাংলা গজল ‘অনায়াসে’ প্রকাশিত হলো। এর শুটিং করেছেন কোথায়?
ভিডিওটির শুটিং আমাদের বাসার ছাদে হয়েছে। ছাদে একটা ঘরও আছে সুন্দর। এতে ড্রইং রুমের আদলে সেট সাজানো হয়। এখানে শুট করতে আমি নিজেই পরামর্শ দিয়েছিলাম। গানটা ক্ল্যাসিকাল ঘরানার, তাই শান্ত পরিবেশ দরকার ছিল। আউটডোরে এমনটা সম্ভব হতো না। কারণ, এমনিতে ভিড় হয়ে যায়। তার ওপর আবার গরম পড়ে অনেক। সবকিছু চিন্তা করে পরামর্শ দিয়েছিলাম, বাসার ছাদে কাজটা নির্বিঘ্নে করা যাবে। প্রথমে একক গান হিসেবে ভাবা হয়েছিল এটি। কিন্তু গজল আঙ্গিকের গান শুনে বাপ্পাকে বললাম, ডুয়েট করলে ভালো হবে। বাপ্পা খুব ভালো একজন শিল্পী, সুরকার। তার সংগীতায়োজনও সুন্দর। বাপ্পা আমার বাসায় এসে সুর তুলে দিল। তারপর তার স্টুডিওতে গিয়ে আমার অংশের রেকর্ড করে নিলাম। বাপ্পাও খুবই ভালো গেয়েছে। সুরটা খুবই সুন্দর। লেখাও খুব ভালো। এর কথা লিখেছে গালিব হোসেন। আমার বিশ্বাস- যারা গান ভালোবাসেন, তারা এটি পছন্দ করবেন।
নতুন গান সুর করেছেন?
সুর তো অনেক করে রেখেছি। দেখা যাক, ভালো কোনো পৃষ্ঠপোষক যদি পাই তাহলে কাজ শুরু করব।
‘জ্বালা জ্বালা’ গানটি ভাইরাল। আপনি এই বয়সে এসেও নাচের উপযোগী একটি গান গেয়ে সাড়া ফেললেন। তরুণ প্রজন্ম এই গানে নেচেছে, উল্লাস করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য রিল বেরিয়েছে। সবকিছু দেখে কেমন লেগেছে?
খুব ভালো লেগেছে। যদিও যখন গানটা গাওয়ার প্রস্তাব পাই, তখন একটু সংকোচ ছিল। কারণ, অনেক বছর চলচ্চিত্রের গান করিনি। ভাবছিলাম গাইব কি না। এ ধরনের গান চ্যালেঞ্জিং। পরে গানটা ভাইরাল হয়ে গেল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিভিন্ন দেশেও মানুষ রিল বানিয়েছে। অনেকে প্রথমে শুনে বিশ্বাসই করতে পারেনি গানটা আমার! অনেকেই কণ্ঠ শুনে চমকে যাওয়ার কথা আমাকে বলেছে। গানটির সুরকার ও সংগীত পরিচালক প্রীতম খুব প্রতিভাবান ছেলে। আমি সবসময় নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। আমি সময়ের সঙ্গে থাকতে চাই। সময়ের সঙ্গে চলতে ভালোবাসি।
তাহলে কি বলতে পারি, আপনার সাফল্যের অন্যতম মূলমন্ত্র হলো সময়ের সঙ্গে তাল মেলানো?
হয়তো। সময় ও শৃঙ্খলা মেনে চলার ইতিবাচক ভূমিকা আছে আমার ক্যারিয়ারে। এজন্যই তো এখনো জোয়ান আছি! কাজের ব্যাপারে আমি সবসময় খুব সিরিয়াস। আমাকে ৪টায় ডাকলে আমি পৌনে ৪টায় পৌঁছে যাই। একটা গান রেকর্ড করার আগে বারবার শুনি। কীভাবে আরও ভালো করা যায়, ভাবি। প্রতিটি গানকে সময় দিই। গান আমার প্যাশন। গান ছাড়া বোধহয় বাঁচতে পারব না। তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না, এমন সময় এলে অস্থির লাগে আমার। আমি বাসায় প্র্যাকটিস করতেই থাকি। নতুন নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টায় সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি। আমি সবসময় ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করি। নেতিবাচক সবকিছু মাথা থেকে সরিয়ে রাখি। হয়তো এজন্য আল্লাহর রহমতে আমার শরীর-স্বাস্থ্য এখনো ভালো আছে।
ফেসবুকে আপনার নামে দুটি আইডি। দুটিই কি আপনার?
হ্যাঁ, দুটিই আমার। 'জ্বালা জ্বালা' বের হওয়ার পর তো এমন জ্বালা হলো (হাসি)! এই জ্বালাটা কিন্তু ভালো! আমার ফলোয়ার অনেক বেড়েছে। ফেসবুকে ভক্তদের কমেন্ট যতটুক পারি পড়ি। সব হয়তো দেখা হয় না। আমার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক আমার মেয়ে (তানি লায়লা) বেশি হ্যান্ডেল করে।
সম্প্রতি ভারতে মর্যাদাসম্পন্ন মিনার-এ-দিল্লি সম্মাননা পেলেন। কিন্তু তখনই আপনার মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়েছিল…
এটা খুব দুঃখজনক। আমি তখন দিল্লিতে। আমাকে বিভিন্ন দেশ থেকে ফোন দিয়ে আমার বন্ধুবান্ধবসহ অনেকে কান্নাকাটি করেছে। আমার কণ্ঠ শুনে তারা বুঝল এখনো ঠিকঠাক বেঁচে আছি! এভাবে মানুষকে আতঙ্কিত করে কী মজা পাওয়া যায় জানি না। আলমগীর সাহেবকে তো দুইবার মেরে ফেলা হয়েছে! এসব যারা করে, তাদের কোনো বিবেক নেই। তারা ভিউ আর টাকা পাওয়ার লোভে এগুলো করে বোধহয়। তা না হলে কোন মানসিকতা থেকে এমন ভুয়া খবর দিতে পারে কেউ? খুব আফসোসের কথা, ভালো কাজগুলোর প্রচার হয় কম। সব ফেক নিউজ ছড়িয়ে দেয় এরা। এটা খুবই অন্যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কি এজন্য দায়ী মনে করেন?
পুরোপুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায় দিতে চাই না। কারণ, এসব প্ল্যাটফর্ম আসার অনেক আগেও আমাকে মেরে ফেলেছিল! প্রকৃত অর্থে দায়ী হচ্ছে মানসিকতা। কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়।
‘মিনার-এ-দিল্লি’ সম্মাননা নিতে ভারতে গিয়ে কেমন আতিথেয়তা পেলেন?
১৫তম দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আজীবন সম্মাননা হিসেবে ‘মিনার-এ-দিল্লি’ পেয়েছি। আয়োজকরা যে সম্মান দেখিয়েছে, এটা কল্পনার বাইরে। বিমানবন্দরে এসে অভ্যর্থনা দিয়েছে, আমাদের হাইকমিশন থেকে সেকেন্ড সেক্রেটারি এসেছিলেন। সম্মাননা গ্রহণের পর বলেছি— এই স্বীকৃতি শুধু আমার একার নয়, এটা বাংলাদেশের ও বাংলাদেশের লোকেদের জন্য। আমার ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী যারা আছেন তাদের জন্য, আমার সব গানের গীতিকার-সুরকার ও সংগীতশিল্পীর জন্য।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে গানে গানে দর্শক-শ্রোতাদের আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন, এটা ভাবলে কি আলাদাভাবে ভালো লাগে?
শুরু থেকেই বাংলাদেশের পতাকা বহন করছি। সবসময় বলি, আমি একজন বাংলাদেশি শিল্পী। যদিও আমার ভক্ত পৃথিবী জুড়ে আছে। তারা আমার জন্য অনেক দোয়া করে। অনেক আশীর্বাদ দেয়। সেজন্য এখনো আল্লাহর রহমতে গান করছি। সবার সামনে সম্মান নিয়ে দাঁড়াতে পারছি। এটিই সবচেয়ে বড় কথা। বাংলাদেশের জন্য আমার প্রথম থেকেই একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে, তা চিরকাল থাকবে। এ দেশ আমার, দেশের শ্রোতাদের জন্য গান করি। বিদেশে যেন দেশের সুনাম হয়, সেই চিন্তা মাথায় রেখে কনসার্ট করতে যাই।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নে দুটি কনসার্টে সংগীত পরিবেশন করতে যাবেন আগস্টে। যখন মঞ্চে ওঠেন কিংবা সেই প্রস্তুতি নেন, তখন আলাদা কিছু মনে হয়?
কনসার্টে সংগীত পরিবেশনের এক দিন আগে থেকে আমার টেনশন শুরু হয়ে যায়। সব যথাযথভাবে হবে কি না, সেই চিন্তায় ডুবে থাকি। ভাবতে থাকি, দর্শক-শ্রোতারা গান পছন্দ করবে কি না। কী হবে না হবে, এই নিয়ে আমার এক দিন বা দুই দিন আগে থেকে টেনশন থাকে। তখন কারও সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলি না। যতটুকু দরকার, ততটুকু বলি। প্রতিটি কনসার্টে মিউজিকে একটু ভিন্নতা আনার চেষ্টা করি। আমাদের একটা ভালো টিম আছে। তাদের নিয়েই সারা পৃথিবী ঘুরছি, বাংলাদেশে অনুষ্ঠান করছি।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
শৃঙ্খলা থাকতে হবে। গানকে সময় দিতে হবে। একটা বড় সমস্যা হলো— ওরা জুতসই প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে না। প্রতিভাবানদের ঠিকভাবে পরিচর্যা করার মতো স্থায়ী জায়গা আমাদের দেশে খুব কম।
দেশীয় সংগীতাঙ্গন নিয়ে কি আপনি আশাবাদী?
আমি সবসময় আশাবাদী। অনেকে বলে আগের মতো ভালো গান নেই। আমি সেটা মানি না। এই যেমন বাংলা গজলের মতো ভালো কাজ হচ্ছে। তবে এগুলোর প্রচার কম। মিডিয়ার উচিত ভালো কাজগুলো বেশি তুলে ধরা।






