কলকাতায় মোশাররফ করিমকে ‘হেনস্থা’, আসলে কী ঘটেছিল?

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিমকে নিয়ে মঙ্গলবার সকালে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, স্ত্রী ও অভিনেত্রী রোবেনা রেজা জুঁইকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় অবস্থানকালে কয়েকজন ‘আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ব্যক্তি’ তাকে ‘লালবদর’ বলে গালাগাল করেন এবং অপদস্থ করার চেষ্টা চালান।
তবে অভিনেতা মোশাররফ করিম বলেছেন, ‘তেমন কিছুই ঘটেনি’। তাহলে ‘হেনস্থার’ খবর কেন ছড়ালো? কারা ছড়ালো? নাকি মোশাররফ করিম ঘটনার সত্যতা আড়াল করতে চাইছেন? যদি তাই হয়, তবে কেন? এমন নানা প্রশ্ন ডালপালা মেলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে।
বিষয়টি শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ নেই। এ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এনসিপির ভাষ্য, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সত্তা ও সার্বভৌম মর্যাদার ওপর চরম ধৃষ্টতা।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া মনে করছেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই মোশাররফ করিমকে অপদস্থ করার ঘটনা ঘটেছে।
তার ভাষ্য, যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ঘরে বসে থাকার মতো অবস্থা নেই।
রাজনীতিক ও চিকিৎসক তাসনিম জারাও মোশাররফ করিমের পাশে থাকার প্রত্যয় জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন।
যেভাবে আলোচনার শুরু
প্রবাসী সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, কলকাতায় অভিনেতা মোশাররফ করিমের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের লোকজন। রাত ১০টার দিকে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার কস্তুরি হোটেলের সামনে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন মোশাররফ করিম। এ সময় আওয়ামী লীগের কিছু লোক মোশাররফ করিমকে ‘লালবদর’ বলে গালাগাল করতে থাকে এবং তার দিকে তেড়ে যায়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পরে ঘটনাস্থলে থাকা আরও কয়েকজন এসে মোশাররফ করিমকে নিরাপদে সরিয়ে দেন।
তবে ওই পোস্টের সঙ্গে তিনি ঘটনার কোনো ছবি বা ভিডিও শেয়ার করেননি। কিন্তু ওই পোস্টের সূত্র ধরেই বাংলাদেশে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও জাওয়াদ নির্ঝরের ফেসবুক পোস্টের সূত্র উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করে। এ বিষয়ে জাওয়াদ নির্ঝরের কোনো মন্তব্য জানতে পারেনি আগামীর সময়। তবে বিষয়টির সত্যতা জানতে অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো তথ্য জানাতে পারেননি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।
কলকাতার সংস্কৃতিকর্মীদের ভাষ্য
আগামীর সময়ের কলকাতা সংবাদদাতা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। তিনিও ঘটনার কোনো সত্যতা জানতে পারেননি। কলকাতার কয়েকজন নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিপ্রেমী বলছেন, যাচাই না হওয়া তথ্য নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
কলকাতার লেখক সম্রাট চক্রবর্তী বলেছেন, ‘মোশাররফ করিম দুই বাংলারই জনপ্রিয় শিল্পী। যদি সত্যিই কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকে, তা অবশ্যই দুঃখজনক। তবে আগে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার।’
অভিযোগ উঠেছে, কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার কস্তুরি হোটেলের সামনে ‘হেনস্থার’ শিকার হন মোশাররফ করিম।
নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী সায়ন্তনী দাস আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় ছোট ঘটনা বড় হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাই সব তথ্য যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। তবে আমরা এরকম কিছু শুনিনি।’
সফটওয়্যার কর্মী শুভম চক্রবর্তী বলেছেন, ‘মোশাররফ করিম নিজেই যখন বলছেন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি, তখন গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত।’
কলকাতার কলেজছাত্রী রিয়া সেনের মতে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান রয়েছে। এমন কোনো ঘটনা নিয়ে অযথা উত্তেজনা তৈরি না করে সত্য তথ্যের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
বর্তমানে মোশাররফ করিম ও তার স্ত্রী ব্যক্তিগত সফরে কলকাতায় রয়েছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা পুলিশি পদক্ষেপের তথ্য জানা যায়নি।
কী বলছেন মোশাররফ করিম?
বিষয়টি জানতে আগামীর সময় যোগাযোগ করেছিল অভিনেতা মোশাররফ করিমের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, ‘লেখার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপারটি ছড়িয়েছে, আসলে ব্যাপারটি তেমন না। মানে এটা নিয়ে যে লিখবেন, তেমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।’
মঙ্গলবার দুপুরে আগামীর সময়ের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে আলাপকালে তিনি বলেছেন, ‘আমরা এখানে এসেছি। আমাদের বেশ কয়েকজন বন্ধু রয়েছেন, তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে ও ঘুরতে। আপনারা জানেন, আমি ঘুরতে পছন্দ করি। কোনো সিনেমার শুটিংয়ে আসিনি। তিন-চার দিনের মধ্যেই ঢাকায় ফিরব।’
মোশাররফ করিমের ভাষ্য, ‘ফেসবুকে নানা কথাই রঙ চড়িয়ে ছড়ানো হয়। কিন্তু একটা সংবাদ লেখার মতো যতটুকু উপাদান প্রয়োজন, ততটুকু এই ঘটনায় নেই। বলতে গেলে তেমন কিছুই ঘটেনি।’
তবে কী ‘ভিত্তিহীন’ ঘটনার প্রতিবাদ?
অভিনেতা মোশাররফ করিম ‘তেমন কিছুই ঘটেনি’ দাবি করলেও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় অবস্থানকালে মোশাররফ করিম ও তার স্ত্রীকে পলাতক আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি হেনস্তা করেছে।
এনসিপির অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বিদেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের কিছু সদস্য পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
এনসিপির ভাষ্য, একজন বরেণ্য শিল্পী ও তার পরিবারের সঙ্গে এমন আচরণ শুধু ব্যক্তিগত হেনস্তা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার ওপর আঘাত।
সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া ফেসবুকে লিখেছেন, যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ঘরে বসে থাকার মতো অবস্থা নেই। ১ আগস্ট ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক ৯ দফা দাবির পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন অভিনেতা মোশাররফ করিম। সেই মোশাররফ করিমের ওপর পলাতক আওয়ামী লীগের হামলা প্রমাণ করে, ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনও ঘৃণা ও সহিংসতার রাজনীতি থেকে বের হতে পারেনি। দেশের বাইরে গিয়েও তারা বাংলাদেশিদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সরকারের প্রতি আহ্বান, অবিলম্বে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে হামলাকারীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করুন। নীরবতা ভেঙে রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের পাশে দাঁড়াতেই হবে।
রাজনীতিক ও চিকিৎসক তাসনিম জারা ফেসবুকে লিখেছেন, বিদেশে যারা হামলা, ডিম নিক্ষেপ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, তারা কেবল নিজেদের হতাশা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। হাসনাত ও মোশাররফ করিমের পাশে আছি। জনগণের অধিকারের পক্ষে অবস্থানের কারণে তাদের উভয়ের প্রতি শ্রদ্ধা।
এই ঘটনায় তিন দফা দাবি জানিয়ে এনসিপি বলেছে, কলকাতায় ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে ভারত সরকারকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত চিহ্নিত অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারকে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি মোশাররফ করিম ও তার স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা প্রদান করতে হবে।







