জুলাই-আহতদের শ্রেণিকক্ষে ফেরাতে ২৫০ কোটি

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই যোদ্ধারা। ছবি : সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটাবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে আহত হয়েছিল অসংখ্য তরুণ। তাদের গুলিবিদ্ধ শরীরের ক্ষত হয়তো ধীরে ধীরে শুকিয়েছে কিন্তু শিক্ষাজীবন থমকে গেছে। অনেকে শুরু করলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। কেউ ভুগছে ট্রমায়। সেই শিক্ষার্থীদের আবার বই-খাতাসহ শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে ২৫০ কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা প্রকল্প নিয়েছে সরকার।
এ প্রকল্পের আওতায় আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, ট্রমা কাটাতে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও শিক্ষা সহায়তাকে এক ছাতার নিচে আনা হবে। একই প্রকল্পে দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রকল্পটি ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে বাস্তবায়ন করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়— এমনটি জানিয়েছেন মাউশির কর্মকর্তারা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতদিন আহতদের সহায়তা মূলত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রিক ছিল। নতুন প্রকল্পটি আহত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আওতায় উপজেলাভিত্তিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ তৈরি করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মাণ করা হবে র্যাম্প, বিশেষ ওয়াশরুমসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। পাশাপাশি শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য রাখা হয়েছে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মশালার ব্যবস্থা। এ ছাড়া পাঁচ বছরের জন্য একজন কম্পিউটার অপারেটর, একজন হিসাবরক্ষক ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় আহত শিক্ষার্থীদের ট্রমা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কাটাতে নিয়মিত কাউন্সেলিং করা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। আন্দোলনের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়েছে এমন শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা, বইখাতা, শিক্ষাসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসহায়ক উপকরণ সরবরাহ করা হবে। দীর্ঘদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত অ্যাকাডেমিক সহায়তা, রিমেডিয়াল শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আহতদের সহায়তায় অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। আহতদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহতদের জন্য ৪০৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এ টাকা দিয়ে জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তবে এবারের প্রকল্পটি হবে শুধু জুলাই আহত শিক্ষার্থীদের জন্য।
জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আগামীর সময়কে বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম নানা কারণে ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ট্রমার কারণে অনেকে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। সরকার চায় এসব শিক্ষার্থীকে আবার শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারায় যুক্ত করতে। প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষা ও চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
সরকারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘জুলাইয়ে আহতদের শুধু সীমিত সময়ের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি যখন আহত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকেন তখন পুরো পরিবারের জন্য সেটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তাই এসব পরিবারকে পুনর্বাসন সম্মানী ও শিক্ষা-চিকিৎসায় বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।
তবে প্রকল্পটি যেন লুটপাট ও দুর্নীতির হাতিয়ার না হয় এবং জুলাইয়ের আসলযোদ্ধা নয়— এমন কোনো ব্যক্তি যেন জালিয়াতি করে এ সুবিধা গ্রহণ করতে না পারে সেদিকে শিক্ষা প্রশাসনকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেন তিনি।




