‘হেলিকপ্টার থেকে সিসিটিভি অ্যাকশন’, নকল কমল ৭৮ শতাংশ

এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্র পরিদর্শনে শিক্ষামন্ত্রী। ফাইল ছবি
২১ মে শেষ হয়েছে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। ‘নকল করলে রেহাই নেই’,— পরীক্ষা শুরুর আগেই এই বার্তা দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। ‘প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়ালেই ব্যবস্থা’, ‘কেন্দ্রে মোবাইল দেখলেই বহিষ্কার’-এমন একের পর এক কড়া বার্তাও দেন তিনি। এমনকি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় পরীক্ষার্থীদের ‘বডিচার্জ’ বা কড়া তল্লাশি করার নির্দেশও দেন মন্ত্রী।
ওই সময় সাইলেন্ট এক্সপেল বা নীরব বহিষ্কারের মতো পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়। পরে বাতিল হয় সেই উদ্যোগ। তবে সমালোচনা সত্ত্বেও পরীক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা। এর ফলে এক বছরের ব্যবধানে নকল কমেছে ৭৮ শতাংশ।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয়ক হিসেবে দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের বহিষ্কারের তথ্য প্রকাশ করে থাকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় বহিষ্কার হয়েছিল রেকর্ড ১,১৫৫ জন পরীক্ষার্থী। ২০২১ সালে করোনা মহামারির কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও সীমিত আকারে পরীক্ষা হওয়ায় এই সংখ্যা নেমে আসে ১২৩ জনে। ২০২২ সালে করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় বহিষ্কার হয় ৫৫৫ জন। ২০২৩ সালে পরীক্ষা পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে এলে অসদুপায়ের দায়ে বহিষ্কারের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯৬ জনে। এরপর ২০২৪ সালে বহিষ্কার হয় ৭৪৭ জন, ২০২৫ নকলের দায়ে বহিষ্কারের সংখ্যা ছিল ৭২১ জন। আর চলতি বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ২০৮ জনে।
শিক্ষামন্ত্রণালয় বলছে, কঠোর নজরদারি, কেন্দ্রভিত্তিক কড়াকড়ি এবং মন্ত্রীর জিরো টলারেন্স বার্তাই বদলে দেয় পরীক্ষার চিত্র। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারই সবচেয়ে শান্ত ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগেই কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখা, কেন্দ্রে মোবাইল ও স্মার্ট ডিভাইসের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রশ্নপত্র পরিবহনে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছিল।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, এবার শিক্ষকরা যেমন সতর্ক ছিলেন, তেমনি প্রশ্নপত্রও করা হয়েছিল অত্যন্ত মানসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ। ফলে পরীক্ষার্থীরা অসদুপায় অবলম্বনের চেয়ে নিজের প্রস্তুতির ওপরই বেশি ভরসা করেছে। আর শিক্ষামন্ত্রীর নকলবিরোধী কঠোর বার্তা কাজ করেছে টনিকের মতো।
ডিজিটাল পাহারাদার
চলতি বছর প্রথমবারের মতো পরীক্ষার সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো বাধ্যতামূলক করা হয় এবং তার পাসওয়ার্ড ছিল শিক্ষাবোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের হাতে। ফলে ঢাকায় বসে মনিটরিং করতে পেরেছে পরীক্ষাসংক্রান্ত কমিটিগুলো।
ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহছানুল কবির মনে করেন, চলতি বছর নকল কম হওয়ার পেছনে যে কয়টি জিনিস কাজ করেছে তার মধ্যে অন্যতম সিসিটিভি। এ যন্ত্রটি মূলত সার্বক্ষণিক ডিজিটাল পাহারাদার হিসেবে কাজ করেছে। যা পরীক্ষার্থী ও কক্ষ পরিদর্শক উভয়ের ওপরই মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে নকলের প্রবণতা কমিয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা জানিয়েছেন, পরীক্ষার সময় প্রতিটি কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষে বসানো এই ক্যামেরাগুলোর লাইভ ফুটেজ সরাসরি যুক্ত ছিল কেন্দ্র সচিবের কক্ষ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ মনিটরিং সেলের সঙ্গে। এর ফলে কোনো পরীক্ষার্থী অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা করলে বা কোনো পরিদর্শক দায়িত্ব অবহেলা কিংবা নকল করতে সহায়তা করলে, তা সঙ্গে সঙ্গেই কন্ট্রোল রুমের মনিটরে ধরা পড়েছে এবং দূর থেকেই তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিয়ে ওই কেন্দ্র বা কক্ষে দায়িত্বরত ভিজিল্যান্স টিমকে অ্যাকশনে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
হেলিকপ্টার মিশন সিসিটিভিতে
২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত সারা দেশে নকলবিরোধী অভিযান চালান তৎকালীন শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। আগাম বার্তা ছাড়াই হেলিকপ্টার নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে নকল ধরতেন তিনি।
২০ বছর পর এখন পূর্ণমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। এবার দেশের ৩ হাজার ৮৮৫টি পরীক্ষা কেন্দ্রের ওপর মন্ত্রী নজর রেখেছেন মহাকাশের স্যাটেলাইট আর হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল স্ক্রিনে। ২০০১ সালের সেই আলোচিত হেলিকপ্টার মিশন এবার সেরেছেন সিসিটিভিতে। তার আগে পরীক্ষা ঘিরে দুমাস ধরে সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন, কথা বলেছেন দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় থাকা কর্তা-ব্যক্তিদের সঙ্গে।
পরীক্ষার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এবার হেলিকপ্টারের কাজ সেরেছি সিসিটিভিতে। এখন মোবাইলটাই তো স্যাটেলাইট। হাতের মোবাইলটাই ছিল সব পরীক্ষাকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রক। কারণ পরীক্ষাকেন্দ্র সিসিটিভির সব পাসওয়ার্ড ছিল আমাদের নিয়ন্ত্রণে। তাই যখন যেটা প্রয়োজন সেটা দেখে নিয়েছি।’ ‘এসব উদ্যোগ অনেকটা নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নিতে সক্ষম হয়েছি। আগামীতে আরও কমবে নকলের পরিমাণ,’ যোগ করেন তিনি।
গত ২১ এপ্রিল দেশের ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে একযোগে শুরু হয় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী।






