ঢাবির হল প্রভোস্টের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ
- ভুক্তভোগীসহ তিনজনকে শোকজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকলেও উল্টো ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীসহ হল সংসদের দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযুক্ত প্রভোস্টের কক্ষ তালাবদ্ধ ও সিলগালা করার অভিযোগে তাদের এ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (২৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং স্বাক্ষরিত পৃথক নোটিশে তাদের শোকজ করা হয়। নোটিশ পাওয়া তিনজন হলেন রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম, ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম এবং সমাজসেবা সম্পাদক তরিকুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইব্রাহিমকে দেওয়া নোটিশে বলা হয়েছে, গত ১৬ আগস্ট ফজলুল হক মুসলিম হলে প্রভোস্টের কক্ষে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সত্যানুসন্ধানে উপাচার্যের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ২০ আগস্ট হল অফিসের মাধ্যমে জানা যায়, ইব্রাহিম প্রভোস্টের কক্ষ তালাবদ্ধ ও সিলগালা করেছেন। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন বা নির্দেশনা ছাড়া কোনো প্রশাসনিক ভবন, অফিস বা কক্ষ তালাবদ্ধ, অবরুদ্ধ বা সিলগালা করার এখতিয়ার কারও নেই। ইব্রাহিমের এ কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি-বিধানের পরিপন্থী এবং প্রশাসনিকভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কোন কর্তৃত্ব, এখতিয়ার বা অনুমোদনের ভিত্তিতে তিনি প্রভোস্টের কক্ষ তালাবদ্ধ ও সিলগালা করেছেন, তার লিখিত ব্যাখ্যা এক কর্মদিবসের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার কারণও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জানাতে বলা হয়। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই অভিযোগে হল সংসদের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম ও সমাজসেবা সম্পাদক তরিকুল ইসলামকেও শোকজ করা হয়েছে। প্রশাসনের এ পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, হল সংসদের নেতারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘আমি নির্যাতনের বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো বিচারের মুখোমুখি হচ্ছি। সিসিটিভি ফুটেজে প্রভোস্টের অপরাধ স্পষ্ট থাকার পরও তাকে বহাল রেখে আমাদের শোকজ করা হয়েছে। আমরা পুরো হল কার্যালয়ে নয়, কেবল অভিযুক্ত প্রভোস্টের কক্ষে তালা দিয়েছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্যাতনের বিচার না করে বরং আমাকে বহিষ্কারের দিকে এগোচ্ছে।’
হল সংসদের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম বলেন, ‘যে প্রভোস্ট দেড় ঘণ্টা ধরে আমার ভাইয়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন, তার পদত্যাগ দাবি করায় এবং তার কক্ষে তালা দেওয়ায় ভুক্তভোগী ইব্রাহিমসহ আমাকে ও সমাজসেবা সম্পাদক তরিকুল ইসলামকে শোকজ করা হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বরং আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভীতি প্রদর্শন বা চাপ প্রয়োগ করে আমাদের ন্যায়সংগত আন্দোলন থামানো যাবে না। সহপাঠীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।’
এর আগে গত ১৬ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, প্রভোস্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করায় তাকে প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনের কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়।
ইব্রাহিমের অভিযোগ, সেখানে জোরপূর্বক তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তা পরীক্ষা করা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তার সিট বাতিল, উপাচার্যের মাধ্যমে ছাত্রত্ব বাতিল এবং সাইবার আইনে মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়। এ সময় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে হলের কর্মচারীদের মাধ্যমে একটি লিখিত স্বীকারোক্তিতে তাকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় প্রভোস্টের কক্ষ তালাবদ্ধ ও সিলগালা করার ঘটনায় ভুক্তভোগীসহ হল সংসদের নেতাদের শোকজ করা হলো।
সার্বিক বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষককেও নোটিশ পাঠিয়েছি এবং তিনি এর লিখিত জবাব দিয়েছেন। আমাদের তদন্ত চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে যতটুকু অপরাধের প্রমাণ আমরা পাব, সে অনুযায়ী শাস্তির সুপারিশ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকেরা বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।’







