তিন চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন এখন যেন এক অদৃশ্য চাপের চক্রে আটকে গেছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রত্যাশিত হারে সৃষ্টি হচ্ছে না, আয় বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে সঞ্চয়ের কথা ভাবাও অনেকের জন্য বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতি ও বাজেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সঞ্চয়ের পতন— এই তিনটি চাপ একসঙ্গে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে অনুষ্ঠিত নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেছেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
ব্রিফিংয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশের সাধারণ মানুষ বর্তমানে তিনটি প্রধান চাপে রয়েছে। প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। সরকার মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার কথা বললেও বাস্তবে তা এখনো ১০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের অভাব এবং মজুরির পতন। নতুন কর্মসংস্থান সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না, আবার যারা কাজ করছেন তারাও প্রত্যাশিত মজুরি পাচ্ছেন না।
তৃতীয়ত, সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়া। পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই যখন অধিকাংশ মানুষ সংগ্রাম করছেন, তখন ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয়ের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেছেন, বাজেটের নীতিকাঠামোকে মোটামুটি ‘চিন্তাশীল’ বলা গেলেও এর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে এটি অপেশাদার এবং পুরনো ধ্যানধারণার অনুসরণ বলে মনে হয়েছে। তার মতে, একটি ভালো নীতিকাঠামোও কার্যকর হতে পারে না, যদি তা দুর্বল আর্থিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
তিনি অভিযোগ করেছেন, বাজেট প্রণয়নে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অপূর্ণতা ও অমনোযোগ রয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তথ্য উপস্থাপনায় ‘ছলচাতুরীর’ আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। তার ভাষায়, অতীতে প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো, মূল্যস্ফীতি কম দেখানো এবং উন্নয়নের নামে বড় প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বর্তমান সরকারও যদি একই পথে হাঁটে, তবে তা হবে অত্যন্ত হতাশাজনক।
ড. দেবপ্রিয়র মতে, বাজেট ঘোষণার চেয়ে এর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, বাজেট পাস হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আর আলোচনা না করে জনগণকে এর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সক্রিয় থাকতে হবে। কারণ অধিকাংশ প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রা সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়নি; বরং গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রস্তুত করা তথ্যের ওপর নির্ভর করে মধ্যমেয়াদি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ফলে সর্বশেষ অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, সব লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাক্কলন হালনাগাদের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেছেন, সময়োপযোগী তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা হালনাগাদ না হলে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে এবং বাজারেও ভুল বার্তা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার নিজেও বিভ্রান্ত হতে পারে। তাই আইন অনুযায়ী তিন মাস অন্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সংসদে বিবৃতি দেওয়ার বিধান আবার চালুর পরামর্শ দেন তিনি।
ব্রিফিংয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ড. দেবপ্রিয়। তার মতে, প্রতিবছর বাজেটের হিসাব মেলাতে অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং সে চাপ গিয়ে পড়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। কিন্তু কর প্রশাসনের সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন নিশ্চিত না করে শুধু রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ বাস্তবসম্মত নয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে সরকার যদি ভর্তুকি কমানোর পথ বেছে নেয়, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।
ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, যাদের মূল্য পরিশোধের সক্ষমতা রয়েছে তাদের ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো উচিত।
সরকার ঘোষিত তিন বছরমেয়াদি ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ কর্মপরিকল্পনার সমালোচনা করে ড. দেবপ্রিয় বলেছেন, প্রথম বছরেই অর্থনীতিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড় করানোর লক্ষ্য অবাস্তব এবং এতে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলে এবং নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সরকারের লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাবে।
তবে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি। কিন্তু বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ ধরনের বরাদ্দ আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এসব ঋণের শর্ত ও কর্মসম্পাদন সূচক যেন দেশের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে




