ঋণের শর্তে পরিবর্তন চায় চীন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্তমান যেসব শর্তে চীন থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোতে পরিবর্তন চায় দেশটি। বিশেষ করে সুদের হার বাড়াতে তৎপর চীন। পাশাপাশি প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) বা স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রেই নতুন শর্ত দিতে চায় দেশটি। এ অবস্থায় নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হোঁচট খাচ্ছে সরকার। চলছে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা। কিন্তু সমাধান আসেনি এখনো। বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়াসহ নানা কারণে এ ধরনের চাপ আসছে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। এর আগে সুদের হার বাড়িয়েছে জাপান। বাংলাদেশের পক্ষে অনেক অনুরোধ করেও ফল হয়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ অবস্থাকে উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইআরডি সূত্র জানায়, চীনের ঋণে বর্তমান সুদের হার প্রকল্পভেদে ২-৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া যেসব শর্ত থাকে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— ম্যানেজমেন্ট ও কমিটমেন্ট ফি, চীনের ঠিকাদার দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা, প্রসেসিং ফি, আপ-ফ্রন্ট ফি, রেয়াতকাল এবং পরিশোধ কম থাকা। এসব পরিবর্তন আনলে সেটি অনেক বেশি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছে ইআরডি।
ইআরডির সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আজম আগামীর সময়কে বললেন, ‘দেশের অবস্থা কিছুটা ভালো হলে ঋণদাতারা সুদের হার বাড়াতে চান। এটি তাদের চিরাচরিত নীতি। কিন্তু তারপরও আমাদের ফাইট করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রকল্পের ধরন, আমাদের বাস্তব অবস্থা এবং বাংলাদেশের মতো একই মানের অন্যান্য দেশ এক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটিও পর্যালোচনা করতে হবে। কিছু দেশ বিশ্বব্যাংক আবার কিছু দেশ ইউএন পলিসি ফলো করে। আমাদের সেসব পর্যালোচনা করে চীনের সঙ্গে শক্তভাবে দক্ষতার নেগোসিয়েশন করতে হবে। বেশি সময় লাগছে। ফলে সময়েরও তো মূল্য আছে। সবকিছু মিলিয়ে চীনসহ অন্য উন্নয়নসহযোগীরা সুদ ও শর্ত বাড়ানোর চাপ দিতে সুযোগ পান। এ অবস্থা থেকে দক্ষতার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে।’
আগামীর সময়ের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর আগে ২০২৩ সালের দিকে রাজশাহী ওয়াসার একটি প্রকল্পের ঋণে কঠিন শর্ত দিয়েছিল চীন। প্রকল্প চলাকালে চীনের নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন হলে শর্ত ছাড়াই নোটিস দিয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়ন বাতিলের ক্ষমতা চাওয়া হয়েছিল দেশটির পক্ষ থেকে। সেই সঙ্গে উচ্চ প্রতিশ্রুতি ও ব্যবস্থাপনা ফি, কম ম্যাচুরিটি এবং সহজলভ্য পিরিয়ড-সংক্রান্ত শর্তও দিয়েছে। তখন চীন থেকে বলা হয়েছিল, অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে চীনা আইন। যেকোনো সালিশ নিষ্পত্তি হবে বেইজিংয়ে। চীনের এসব প্রস্তাবের কঠোর বিরোধিতা করে বাংলাদেশ। ‘রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ নামের প্রকল্পের জন্য ২৭ কোটি ৬২ লাখ মার্কিন ডলার বা ওই সময়ের ডলারের রেট অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ চাওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ দিতে সম্মতি দিয়ে ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি একটি ঋণচুক্তির খসড়া পাঠায় চীন। পিবিসির ঋণ চুক্তি খসড়াটির ওপর ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি হয় আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা। ইআরডির তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ও অনুবিভাগ (এশিয়া, জেইসি ও বৃত্তি) প্রধান এবং বর্তমান ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী সভায় সভাপতিত্ব করেন। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা মতামত তুলে ধরেন। এরপরই চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে মতামত জানিয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয় ইআরডির পক্ষ থেকে।
সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরের সময় স্বাক্ষর হয় ‘স্ট্রেনদেনিং ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড প্রডাকশন ক্যাপাসিটি কো-অপারেশন’ শীর্ষক এমওইউ। সেখানে রাজশাহী ওয়াসার প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে আরও আলাপ-আলোচনার পর এ প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি এগিয়ে যায়। চীনের পাঠানো ঋণচুক্তির প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ঋণের সুদের হার হবে ২ শতাংশ। ব্যবস্থাপনা ফি হিসেবে এককালীন দিতে হবে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ অর্থ।




