বন্ধ হচ্ছে আড়ালে থেকে শেয়ারহোল্ডার হওয়ার সুযোগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অসাধু ব্যবসায়ী বা কালো টাকার মালিকরা প্রায়ই নিজেদের নামে কোম্পানি খুলতেন না বলে অভিযোগ আছে। তারা তাদের গাড়ির চালক, পিয়ন, আত্মীয় বা কাল্পনিক ব্যক্তির নামে শেয়ার কিনে পেছনের দরজায় বসে সমস্ত মুনাফা ও নিয়ন্ত্রণ ভোগ করতেন। মূলত পর্দার আড়ালে থেকে প্রকৃত সুবিধাভোগী বা বেনামি এই মালিকদের চিহ্নিত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে কোম্পানি আইনের সংশোধনী খসড়া। আইনটি পাস হলে শেয়ারে তার মালিকানা না থাকলে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকার সুযোগ বন্ধ হবে।
নতুন আইনে শেয়ারের প্রকৃত মালিক কে, সে ঘোষণা রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিস অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) বাধ্যতামূলক দিতে হবে। অন্যথায় গুনতে হবে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা। হারাবেন ওই শেয়ারের ওপর অধিকার।
সূত্রমতে, প্রস্তাবিত কোম্পানি আইনের ধারা ৪০১খ এবং ধারা ৪০১গ সংশোধন করে আইনপ্রয়োগকারী ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর হাতকে শক্তিশালী করার জন্য যুক্ত করা হচ্ছে।
অনেক সময় কোনো কোম্পানি বা পরিচালকের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ব্যাংকঋণ জালিয়াতি, কিংবা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উঠলে তদন্তকারী সংস্থা আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পুলিশ তাৎক্ষণিক নথিপত্র পেত না আরজেএসসি থেকে। আইনগত জটিলতায় পড়ে তদন্ত বিলম্বিত হতো। ফলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক না থাকায় অপরাধীদের ধরা কঠিন হতো। সে কারণে বিএফআইইউ এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সরাসরি তথ্যবিনিময়ের সুযোগ রাখা বাধ্যবাধকতামূলক করা হয়েছে। এতে সংশোধনী আইন কার্যকর হওয়ার পর বিএফআইইউ, এনবিআর, কাস্টমস বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডিং, ব্যাংক তথ্য বা আর্থিক গোপন নথি এক ক্লিকেই বা আনুষ্ঠানিক অনুরোধেই পেয়ে যাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইন্টারপোল, এগমন্ট গ্রুপ (ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটগুলোর বিশ্ব সংস্থা) বা বিদেশের যেকোনো অপরাধ তদন্তকারী সংস্থার কাছে কোনো কোম্পানির ব্যাকগ্রাউন্ড ও প্রকৃত মালিকানার তথ্য পাঠাতে পারবে। পাশাপাশি তাদের থেকেও তথ্য চাইতে পারবে। এ ছাড়া এনবিআর সরাসরি কোম্পানির মূল ফাইলিং ও শেয়ার ট্রান্সফারের রেকর্ড যাচাই করতে পারবে। ফলে ভুয়া খরচ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়ার রাস্তা বন্ধ হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বৈধ ব্যবসায়ী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এটি তাদের ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ও অভ্যন্তরীণ করপোরেট স্ট্র্যাটেজি ফাঁসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি তদন্তের নামে কোনো সৎ ব্যবসায়ীকে হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংশোধনী খসড়ায় ৫০ কোটি টাকার অধিক পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিগুলোয় পেশাদার কোম্পানি সচিব নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ দুটি সংযোজন হচ্ছে সবচেয়ে বড়।
জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনটি মূলত ব্রিটিশ আমলের ১৯১৩ সালের আইনের হালনাগাদ সংস্করণ ছিল। পরে বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক করপোরেট জগতের সঙ্গে সামঞ্জস্য হারিয়ে ফেলে। যে কারণে দীর্ঘ তিন দশক পর চারটি প্রেক্ষাপটে আইনে আমূল সংস্কার করা হচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সুপারিশ বাস্তবায়ন। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, বিশেষ করে আরজেএসসির আইনি কাঠামো শক্তিশালী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত পরামর্শ বাস্তবায়ন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, সংশোধিত আইনটি কার্যকর হলে ম্যানুয়াল ও আদালতনির্ভর জটিলতা কমবে। পাশাপাশি তৈরি হবে অটোমেশন এবং দ্রুত প্রশাসনিক কার্যক্রম নিষ্পত্তির সুযোগ। এ ছাড়া এক ব্যক্তি কোম্পানি, আধুনিক সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি সংস্থার সঙ্গে তথ্যবিনিময়ের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ এনে দেবে।
সূত্রমতে, কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সশরীরে উপস্থিতি বা ডিজিটাল/ বায়োমেট্রিক সত্যতা নিশ্চিতকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। এর মধ্য দিয়ে জালিয়াতি বা প্রতারণামূলক একই বা সদৃশ নামে কোম্পানি খোলা-বন্ধে কড়াকড়ি আনা হয়েছে। এ ছাড়া সংশোধনীতে পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকের সমন্বয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা সিএসআর কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোম্পানিকে তাদের অর্জিত মুনাফা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করতে হবে এবং তার বিবরণ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। সূত্র বলছে, কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা পেছানোর আবেদন সভার সময় পার হওয়ার আগেই (পূর্ববর্তী ৩০ দিনের মধ্যে) করতে হবে। পরিচালকদের যোগ্যতামূলক শেয়ার অর্জনের সময় ৬০ থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে এবং বন্ধক/ চার্জ নিবন্ধনের সময় ২১ থেকে ৩০ দিন করা হয়েছে।
সংশোধনী আইনে কোম্পানি পরিচালকদের ওপর কঠোর দায়বদ্ধতা চাপানো হয়েছে। ভুল রিটার্ন দাখিল বা সময় পার হলে জরিমানা প্রতিদিনের হিসাবে ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা বা এককালীন ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক কোম্পানি সচিব রাখা বা সিএসআর ফান্ডের আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলা কিছুটা বাড়তি ব্যয়ের কারণ হতে পারে।






