জলবায়ু পরিবর্তনে কর্মশক্তির ওপর দ্বৈত চাপ, প্রমাণভিত্তিক নীতির তাগিদ

সংগৃহীত ছবি
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের (এসওবিই) উদ্যোগে আয়োজিত নেক্সাস সেমিনার সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে বক্তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপজনিত চাপ (হিট স্ট্রেস) ও বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কর্মশক্তি, শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জলবায়ু-সহনশীল কর্মশক্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ইউআইইউ ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত 'দ্য ডাবল বার্ডেন অব ক্লাইমেট চেঞ্জ: হাউ হিট স্ট্রেস অ্যান্ড এয়ার পলিউশন স্ট্র্যাটিফাই দ্য ওয়ার্কফোর্স' শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সিনিয়র ইকোনমিস্ট ড. মিনহাজ মাহমুদ।
মূল প্রবন্ধে ড. মিনহাজ মাহমুদ তুলে ধরেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান তাপজনিত চাপ ও বায়ুদূষণ একসঙ্গে একটি 'দ্বৈত বোঝা' তৈরি করছে, যা কর্মশক্তির উৎপাদনশীলতা, শ্রমবাজার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এশিয়ার কয়েকটি দেশের তথ্য-উপাত্তভিত্তিক গবেষণার আলোকে তিনি বললেন, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমানভাবে প্রভাব ফেলে না। বাইরে কর্মরত শ্রমিক, নারী, প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরাঞ্চলের বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাব শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাকেও আরও প্রকট করে তুলছে।
ড. মাহমুদ জানালেন, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে জলবায়ু-সহনশীল কর্মশক্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বললেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
সেমিনারের গুরুত্বপূর্ণ পর্বে জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন এডিবির ইকোনমিক্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইমপ্যাক্ট বিভাগের প্রিন্সিপাল ইকোনমিস্ট ড. নাজমুল চৌধুরী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল বায়েস।
আলোচনায় প্যানেলিস্টরা বললেন, পরিবর্তিত জলবায়ু বাস্তবতায় জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে জলবায়ু-সহনশীলতাকে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন জোরদার, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উদীয়মান পরিবেশগত ও কর্মশক্তি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার, শিল্পখাত ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত ও টেকসই সহযোগিতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এই বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্বই ভবিষ্যতের জলবায়ু-সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নেক্সাস সেমিনার সিরিজের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, জলবায়ু-সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে অর্থবহ একাডেমিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, সরকার, শিল্পখাত, নীতিনির্ধারক এবং শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নেক্সাস সেমিনার সিরিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ইউআইইউর বিবিএ প্রোগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক ড. সালমা করিম। প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।




