ব্যাংক খাতের বাঁকবদলে প্রয়োজন পেশাদার মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা

ফিনান্সিয়াল প্রফেশনাল ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট কন্ট্রিবিউটর মো. রুহিন হোসেন (প্রিন্স)। সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাংক খাত পালন করছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিশ্বায়নের এই যুগে ব্যাংক খাত এখন আর শুধু টাকা আদান-প্রদান বা ঋণ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এখন এটি পরিণত হয়েছে একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং গ্রাহকদের উন্নত সেবা দেওয়া লক্ষ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন কেবল পুঁজি বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর আগের চেয়ে দিচ্ছে অনেক বেশি জোর। প্রথাগত পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাংকগুলো এখন ঝুঁকছে স্ট্র্যাটেজিক হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (এসএইচআরএম) বা কৌশলগত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার দিকে। ব্যাংক খাতের এই আমূল পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দক্ষ জনবল নির্বাচন, তাদের ধরে রাখা এবং ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যবসায়িক লক্ষ্যের সঙ্গে কর্মীদের ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে একীভূত করা।
ব্যাংক খাতে পেশাদার এইচআর সেবার গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রথমে ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট বা মেধা ব্যবস্থাপনার দিকটি অনুধাবন করা জরুরি। বর্তমান ব্যাংক খাতে শুধু কর্মী নিয়োগ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সঠিক পদের জন্য সঠিক মানুষকে খুঁজে বের করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পেশাদার এইচআর টিম এখন এমপ্লয়ি ভ্যালু প্রোপোজিশন (ইভিপি) তৈরির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা একজন দক্ষ পেশাজীবীকে অন্য ব্যাংকের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ব্যাংকে কাজ করতে করে তোলে আগ্রহী। ইভিপি মূলত একটি ব্যাংকের কর্মপরিবেশ, সংস্কৃতি এবং সুযোগ-সুবিধার সমন্বিত রূপ, যা ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যাংকটিকে প্রতিযোগীদের থেকে আলাদা করে। ব্যাংকগুলো এখন আর শুধু বেতনকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নিয়োগ দিচ্ছে না, বরং কর্মীর ক্যারিয়ার গ্রোথ বা প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়েও করছে কাজ।
পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা কর্মক্ষমতা ব্যবস্থাপনা ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। ফুরিয়ে আসছে প্রথাগত বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) বা মূল্যায়ন পদ্ধতির দিন। আধুনিক পেশাদার এইচআর এখন কন্টিনিউয়াস ফিডব্যাক বা নিরবচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া এবং কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরসের (কেপিআই) ওপর ভিত্তি করে যাচাই করছে কর্মক্ষমতা। ব্যাংকিং খাতের প্রতিটি কর্মীর কাজের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, যা ব্যাংকের সামগ্রিক বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে যুক্ত। পেশাদার এইচআর কর্মকর্তারা এখন এই লক্ষ্যগুলো নির্ধারণে এবং কর্মীদের নিয়মিত মেন্টরিং বা পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের দক্ষতাকে ক্রমাগত পরিচালিত করছেন উন্নয়নের দিকে। এই প্রক্রিয়াটি টোটাল রিওয়ার্ডস বা সামগ্রিক পুরস্কার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, যেখানে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি স্বীকৃতি এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগও পায় সমান গুরুত্ব।
ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং ফিনটেক বিপ্লবের এই সময়ে ব্যাংকিং খাতে লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এলঅ্যান্ডডি) অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের কর্মীরা যাতে নতুন প্রযুক্তি, সাইবার সিকিউরিটি এবং আধুনিক ব্যাংক নিয়মনীতি সম্পর্কে আপ-টু-ডেট থাকে, সেজন্য পেশাদার এইচআর বিভাগগুলো নিয়মিত আয়োজন করছে ট্রেনিং মডিউল ও ওয়ার্কশপ। এটি শুধু কর্মীদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে না, বরং ব্যাংকের অপারেশনাল রিস্ক বা পরিচালন ঝুঁকি কমাতেও করছে সাহায্য। এ ছাড়া অর্গানাইজেশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওডি) বা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এইচআরের ভূমিকা এখন ব্যাপক। যেকোনো পরিবর্তনের সময়, যেমন নতুন ডিজিটাল সিস্টেম চালু করার ক্ষেত্রে, চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট বা পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার প্রধান সারথি হিসেবে কাজ করছে এইচআর বিভাগ। কর্মীদের মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে এবং প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক সংস্কৃতি বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছে তারা।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারত্বের বিকাশে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রভাব অনস্বীকার্য। এখন ব্যাংকগুলোতে শুধু সাধারণ ডিগ্রিধারী নয়, বরং চাহিদা বাড়ছে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে বিশেষায়িত ব্যক্তিদের। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন পেশাদার ডিগ্রি যেমন সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের (এসএইচআরএম) সার্টিফিকেশন, চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব পার্সোনেল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিআইপিডি) মেম্বারশিপ বা ডিগ্রি এখন এইচআর পেশাজীবীদের জন্য বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। এ ছাড়া দেশি ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ (এইচআরএম মেজর) ডিগ্রিধারী বা প্রফেশনাল ইন হিউম্যান রিসোর্সের (পিএইচআর) মতো সার্টিফিকেশন থাকা পেশাদাররা ব্যাংক খাতের জটিল এইচআর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় রাখছেন বেশি কার্যকর ভূমিকা। এই পেশাদার জ্ঞান ব্যাংকগুলোকে শ্রম আইন মেনে চলা, জটিল কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক মানের এইচআর নীতি প্রণয়নে করছে সহায়তা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে পেশাদার এইচআর সেবার গুরুত্ব এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং একটি ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তা। ব্যাংকগুলো অনুধাবন করতে পারছে যে, তাদের সব থেকে বড় সম্পদ হলো তাদের মানবসম্পদ। যখন একটি ব্যাংকের এইচআর বিভাগ কৌশলগতভাবে কাজ করে, তখন তা সরাসরি ব্যাংকের মুনাফা, গ্রাহক সন্তুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। দক্ষ এইচআর ব্যবস্থাপনা কর্মীদের মধ্যে কাজের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে, যা ব্যাংকের সামগ্রিক সেবার মানকে উন্নত করে। তাই আগামী দিনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য পেশাদার মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার চর্চা আরও বেগবান হবে, এটাই সময়ের দাবি।

