ই-গাড়িতে করছাড়, দাম কমতে দেরি
- ভোক্তা পর্যায়ে সুফল পৌঁছাতে লাগবে আরও কিছুদিন
- বাজারে নেই তাৎক্ষণিক প্রভাব
- নজরদারিতে নেই কাঠামো

সংগৃহীত ছবি
দেশে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) প্রসারে বড় ছাড় দিয়েছে সরকার। তবে চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্ক কমানোর ঘোষণা এলেও এখনই কমছে না ইলেকট্রিক গাড়ি, মোটরবাইক বা স্কুটার- কোনোটিরই দাম।
ভোক্তা পর্যায়ে এই সুবিধার সুফল পৌঁছাতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। মূলত আমদানিকারকদের কাছে থাকা আগের উচ্চ শুল্কের পুরনো স্টক এবং বিশ্ববাজারের সরবরাহ চেইনের কারণে বাজারে পড়ছে না এর তাৎক্ষণিক প্রভাব।
সবুজ অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে এবারের বাজেটে দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে সরকার। ইলেকট্রিক গাড়ি ও বাইক আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান করভার উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশ জুড়ে বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন স্থাপনের গতি বাড়াতে চার্জার ও চার্জিং সরঞ্জাম আমদানির মোট করহার ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সরাসরি শূন্য শতাংশে নামানোর এসেছে ঘোষণা।
যদিও রাজধানীর প্রধান প্রধান ইলেকট্রিক মোটরবাইক ও স্কুটার বিক্রয়কেন্দ্রগুলো ঘুরে আগের দামেই বেচাবিক্রি চলতে দেখা গেছে। বাজেট ঘোষণার পরও শোরুমগুলোতে ঝুলছে আগের মূল্য তালিকাই।
মিরপুরের ভি মোটো শোরুমের ব্যবস্থাপক ইমরান জানালেন, বাজেটে কর কমলেও দাম কমানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে মূল কোম্পানি থেকে। এখন পর্যন্ত তারা পুরনো দামেই পণ্য বিক্রি করছেন।
একই চিত্র মোহাম্মদপুরের ভি মোটো শোরুমেও। এই কেন্দ্রটির বিক্রয় প্রতিনিধি রক্তিম জানান, তাদের শোরুমে এখন যেসব স্কুটার আছে, সেগুলো বাজেট ঘোষণার অনেক আগেই আমদানি করা। অস্ট্রেলিয়ান ব্র্যান্ডের এই বাহনগুলো মূলত তৈরি হয় চীনে। নতুন চালানের পণ্য দেশে না পৌঁছানো পর্যন্ত নেই দাম কমার কোনো নিশ্চয়তা। কমলেও তা হতে পারে খুব সামান্য।
ডংজিন টেকনোলজির শপ ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহর মতে, আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ও কর হ্রাসের সুবিধা যদি কোম্পানিগুলো সততার সঙ্গে ক্রেতাদের দেয়, তবেই শুধু বাজারে দামের ওপর পড়বে ইতিবাচক প্রভাব।
ইলেকট্রিক যানের আরেকটি ব্র্যান্ড আরা। ব্র্যান্ডটির বিক্রয় প্রতিনিধি জয় জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দাম কমানোর কোনো নির্দেশনা পাননি তারা। ফলে এই মুহূর্তে দাম কমার নেই কোনো সম্ভাবনা।
কেন এই শুল্কছাড়
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশের যাতায়াতব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণটাই নির্ভরশীল আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির (পেট্রল, ডিজেল, অকটেন) ওপর। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই শুল্কছাড়ের মূল উদ্দেশ্য হলো আমদানি করা জ্বালানির ওপর চাপ কমানো এবং দেশে ব্যাটারিচালিত আধুনিক যানবাহনের একটি টেকসই ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ তৈরি করা।
এই খাতসংশ্লিষ্টরা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেট দীর্ঘমেয়াদে দেশের পরিবহন খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এর সুফল না পাওয়ার পেছনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো পুরনো চালানের স্টক। বাজারে বর্তমানে যেসব গাড়ি বা বাইক রয়েছে, সেগুলো আগের ৩৯.৭৫ শতাংশ বা তারও বেশি কর দিয়ে আনা। আমদানিকারকরা লোকসান দিয়ে এগুলো কম দামে বিক্রি করবেন না। আরেকটি হলো- কোম্পানিগুলোর মূল্য সমন্বয় নীতি। করছাড়ের সুফল পুরোপুরি ক্রেতারা পাবেন নাকি আমদানিকারকরা তা নিজেদের মুনাফা হিসেবে রেখে দেবেন, তা নজরদারির কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারিব্যবস্থা তৈরি হয়নি এখনো।
বৈদ্যুতিক যান জনপ্রিয় করে তুলতে এর চার্জার ও চার্জিং সরঞ্জাম আমদানির শূন্য শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। চার্জিং স্টেশনের সরঞ্জাম শুল্কমুক্ত করার কারণে ব্যবসায়ী বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সহজেই নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপন করতে পারবে চার্জিং পয়েন্ট। এটি দূর করবে ইভি খাতের সবচেয়ে বড় বাধা ‘রেঞ্জ এনজাইটি’ বা চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়। ফলে নতুন চালানের পণ্য বাজারে এলে এবং চার্জিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইলেকট্রিক যানবাহনের বাজার ক্রেতাদের জন্য বেশ সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।


