জলবায়ুর প্রভাব চিংড়িশিল্পে
দেড় দশকে রপ্তানি কমেছে ২২%

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের মৎস্য রপ্তানি খাতে চিংড়ি এখনো প্রধান পণ্য। যার বড় একটি অংশের জোগান আসে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকে। তবে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সাদা সোনাখ্যাত হিমায়িত চিংড়ির বাজার। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্রমেই চাপে পড়ছে উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই খাত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে উচ্চ চাহিদা থাকলেও গত দেড় দশকে রপ্তানি কমেছে ২২ দশমিক ৬১ শতাংশ।
কারণ হিসেবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণের ফলে জলাশয় সংকুচিত হওয়া, লোনাপানির উৎস কমে যাওয়া, ভাইরাসের আক্রমণ, অতিরিক্ত গরমে পানির তাপমাত্রা বেড়ে চিংড়ি মারা যাওয়ায় ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে খাতটি।
চিংড়িচাষিদের ভাষ্য, উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ লোনাপানির ঘের অগভীর। সাধারণত দুই থেকে তিন ফুট গভীর এসব ঘেরে সূর্যের তাপ পড়ে সরাসরি। ফলে তাপপ্রবাহের সময় দ্রুত বেড়ে যায় পানির তাপমাত্রা। ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়, যা বাগদা চিংড়ির জন্য তৈরি করে মারাত্মক ঝুঁকি। তাপজনিত চাপ, অক্সিজেন সংকট এবং পানির গুণগত মানের অবনতি চিংড়িকে রোগপ্রবণ করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে মড়কও দেখা দেয়।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা এলাকার শহিদুল ইসলাম দুই দশক ধরে চাষ করছেন বাগদা চিংড়ি। ৩০ বিঘার লোনাপানির ঘের থেকে একসময় ভালো লাভ পেলেও কয়েক বছর ধরে তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে প্রচণ্ড গরম। প্রতি বছর মে ও জুন মাসে ঘেরের পানির তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে মারা যাচ্ছে চিংড়ি। এ বছরও কয়েক দিনের ব্যবধানে তার ঘেরে মারা গেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চিংড়ি।
‘আগেও গরম পড়ত, কিন্তু এখনকার মতো এত তীব্র ছিল না। রোদ উঠলেই বেড়ে যায় পানির তাপমাত্রা। মাছ মরে ভেসে ওঠে। কিছু আবার দুর্বল হয়ে মারা যায় ধীরে ধীরে। এখন পুঁজি টিকিয়ে রাখাই কঠিন’— বললেন তিনি।
সাতক্ষীরা চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহা. শফিকুল ইসলামের ভাষায়, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে পানিতে অক্সিজেন কমে গেলে চিংড়ি তাপজনিত চাপের মধ্যে পড়ে। ফলে দুর্বল হয়ে যায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা।
তবে ঘেরে পর্যাপ্ত গভীরতায় পানি সংরক্ষণ, নিয়মিত নতুন পানি ঢোকানে, রাতের বেলায় এয়ারেটর চালু রাখা এবং পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, পিএইচ ও দ্রবীভূত অক্সিজেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
দেশে রপ্তানিযোগ্য চিংড়ির মধ্যে বাগদার অংশই সবচেয়ে বেশি। ফলে উৎপাদন কমে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে। মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর খুলনার তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে খুলনা অঞ্চলের তিন জেলা থেকে চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল ৪২ হাজার ৪৮৯ দশমিক ১০৩ টন, যা থেকে আয় হয়েছিল ২ হাজার ৫৩৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ৫৫১ দশমিক ৫৩০ টনে এবং রপ্তানি মূল্য নেমে আসে ২ হাজার ২৪৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ আরও কমে ৩২ হাজার ৮০২ টনে নেমে আসে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় রপ্তানি মূল্য বেড়ে ২ হাজার ৭০০ কোটি ২২ লাখ টাকায় পৌঁছায়। পরবর্তী কয়েক বছর রপ্তানি ওঠানামা করেছে ৩০-৩৩ হাজার টনের মধ্যে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানি কমে ২৯ হাজার ৬ টনে দাঁড়ায় এবং মূল্য নেমে আসে ২ হাজার ২৯০ কোটি ২০ লাখ টাকায়। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনা মহামারীর মধ্যেও রপ্তানি বেড়ে ৩৩ হাজার ৭২৭ দশমিক ৫৫৭ টনে পৌঁছায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ স্থিতিশীল থাকলেও মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯৬২ কোটি ৯১ লাখ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে এই আয় বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
তবে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ও দাম দুটিই কমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র ২৫ হাজার ১৯৭ টন চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ওই বছর রপ্তানি আয়ও কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৪৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি ঘটে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। ওই বছর রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে ৩৪ হাজার ৮৭৬ দশমিক ৩৬৫ টনে পৌঁছায় এবং রপ্তানি মূল্যও প্রায় ৩ হাজার ১০৯ কোটি ৩০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-মে মাস পর্যন্ত) রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৮৮২ দশমিক ১৪০ টনে। একই সঙ্গে রপ্তানি মূল্য কমে হয়েছে ২ হাজার ৩১৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে রপ্তানি আয় কমেছে ৭৯৪ কোটি টাকার বেশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উৎপাদন সংকট ও রোগের কারণে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার সম্ভাব্য রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বাস্তবতা। উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে এর প্রভাব।’
তার মতে, এটি শুধু একটি মৎস্য খাতের সংকট নয়; উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত। এখনই অভিযোজন ব্যবস্থা জোরদার করা না গেলে ভবিষ্যতে চিংড়ি উৎপাদন পড়বে আরও ঝুঁকির মুখে।






