কোথায় গেল সাগরের মাছ?

প্রত্যাশিত মাছের দেখা না পেয়ে এখন হতাশা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জেলেদের, ছবি: আগামীর সময়
সামুদ্রিক মাছের নিরাপদ প্রজনন, উৎপাদন বৃদ্ধি করতে চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন দেশের সমুদ্রসীমায় ৫৮ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশায় গভীর সমুদ্রে পাড়ি জমান উপকূলের হাজারো জেলে। তবে প্রত্যাশিত মাছের দেখা না পেয়ে এখন হতাশা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
পটুয়াখালীর মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকার জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে কয়েক দফা সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলেও অধিকাংশ ট্রলার আশানুরূপ মাছ নিয়ে ফিরতে পারছে না। অনেক ট্রলার খালি হাতে কিংবা অল্প মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছে। ফলে জ্বালানি তেল, বরফ, খাদ্য ও শ্রমিক খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রলার মালিকদের।
মহিপুর মৎস্য বন্দরের জেলেদের ভাষ্য, সাধারণত নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের প্রাচুর্য দেখা যায়। কিন্তু এবার কয়েক দিন ধরে গভীর সমুদ্রে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছি না। এতে জেলে, ট্রলার মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা।
চাহিদা অনুযায়ী মাছের সরবরাহ না থাকায় বাজারে ক্রেতাদের মাছ কিনতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইলিশের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বর্তমানে বেশ চড়া। একইভাবে সামুদ্রিক অন্যান্য মাছের দামও আগের তুলনায় বেড়েছে।
কুয়াকাটা মাছ বাজারের ব্যবসায়ী হাসান জানান, বর্তমানে বাজারে এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ মণপ্রতি প্রায় ১ লাখ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা কেজিপ্রতি প্রায় ২৫০০ টাকা। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি প্রায় ১৫০০ টাকা এবং ছোট আকারের ইলিশ ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে ছিলো। ইলিশ ছাড়াও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের দামও বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দরসহ উপজেলার বিভিন্ন আড়তের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ হাজার টন ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ আহরণ ও বাজারজাত করা হয়েছিল। তবে চলতি অর্থবছরে সমুদ্রে মাছের স্বল্পতা অব্যাহত থাকলে আহরণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে, আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
মহিপুর মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আখি ফিশ ও তাহুরা ফিশের ম্যানেজার রাজু জানান, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা আশানুরূপ মাছ পাচ্ছেন না। ছোট ট্রলারগুলো সমুদ্রে গিয়ে খরচের তুলনায় খুব কম মাছ নিয়ে ফিরছে, আর বড় জে-বোটগুলোর অনেকগুলোই কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করেও লোকসানের মুখে পড়ছে
আলীপুরের জেলে সেলিম ফরাজী জানান, সমুদ্রে গিয়ে আশানুরূপ মাছ পাচ্ছি না। অথচ অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করছে। সরকার চাইলে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দ্রুত এসব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব।
আলিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছ বিক্রি করতে আসা নোয়াখালীর জেলে আলম গাজী জানিয়েছেন, অনেক আশা নিয়ে সমুদ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু যে টাকা খরচ করে মাছ ধরতে গেছি, ঘাটে ফিরে সেই টাকার মাছ পাইনি। আগে যেখানে জালে ভালো মাছ উঠত, এখন সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।
মহিপুর মৎস্য বন্দর আড়ৎ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা জানান, অবৈধ ট্রলিং বোটের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। বর্তমানে সমুদ্রে মাছ না পাওয়ায় জেলেরা হতাশ। এসব অবৈধ ট্রলিং বোট যদি অবাধে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে সমুদ্রে মাছের সংখ্যা আরও মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে আলিপুর মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী কামাল ব্যাপারী বর্তমানে প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ না পাওয়ার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন। তিনি জানান, সামুদ্রিক মাছের প্রাপ্যতা অনেকটাই আবহাওয়া, বিশেষ করে বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে। এ বছর এখন পর্যন্ত আশানুরূপ বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে মাছও তুলনামূলক কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে যারা গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ শিকার করছেন, তারা মোটামুটি মাছ পাচ্ছেন। বিপরীতে উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারগুলো প্রত্যাশিত মাছ পাচ্ছে না। বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক হলে এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে আগামী দিনে মাছের পরিমাণ বাড়তে পারে।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক কে এম বাচ্চু বলেছেন, বর্তমান সরকার গেজেটের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা 'কুয়াকাটা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ অঞ্চলের ২০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মাছ শিকার নিষিদ্ধ রয়েছে।
এই আইন ও নির্দেশনার বিষয়গুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে জেলেদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা জরুরি। পাশাপাশি এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, বললেন তিনি।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেছেন, সমুদ্রে মাছ কম পাওয়ার বিষয়টি মূলত প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিষয়। এর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
অবৈধ ট্রলিং বোটের বিষয়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোস্ট গার্ডের সহায়তায় গত ছয় মাসে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রায় ১০টি মামলা করা হয়েছে। যারা এখনো অবৈধভাবে ট্রলিংয়ের মাধ্যমে মাছ আহরণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে, ভাষ্য বিজন কুমারের।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল হক বলেছেন, সমুদ্রে মাছ কম পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় বেহুন্দি জাল ও ছোট ফাঁসের অবৈধ জালের ব্যবহার অন্যতম। এসব জালে মাছের পোনা, ডিম ও বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী ধরা পড়ে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
তিনি বললেন, গভীর সমুদ্রে নিষিদ্ধ ট্রলনেট ব্যবহারের ফলে লক্ষ্যভিত্তিক মাছের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক জীব নির্বিচারে আহরণ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মাছ ধরার জাহাজ নির্ধারিত গভীরতার বাইরে এসে মাছ ধরায় মৎস্যসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।






