আলো পৌঁছেনি ২৮ বছরেও

‘বিয়ের কয়েক বছর পরে যেখানে ছিলাম, সেখানে বাতি কী দিয়া জ্বলে, জানা নাই। পরে নদীভাঙনের লাইগা আইলাম চরে। হেই চরেও বাতি নাই। আমাগো কি দেখবে না কেউ বাপু?’ এমন আকুতিভরা প্রশ্ন ৯০ বছরের বৃদ্ধা আলেকা বিবির।
ঘটনাস্থল মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের সামাদ খান কান্দি গ্রাম। সেখানে বাস করে প্রায় ২০০ পরিবার। সেই পরিবারের একজন আলেকা বিবি। ২৮ বছর পার হলেও সেখানে পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ। গড়ে ওঠেনি ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। প্রায় দুই হাজার মানুষের এই জনপদে নেই কোনো নাগরিক সুবিধা।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, একসময় এসব পরিবারের ছিল নিজস্ব ভিটেমাটি ও ফসলি জমি। তবে পদ্মা নদীর ভাঙনে হারিয়ে গেছে সব। বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেন সরকারি জমিতে। সেখানেই বাস করছেন বছরের পর বছর। তাদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ ও মাছ শিকার। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন জেলেরা নদীতে নামেন, আর মাঠে কাজ করেন কৃষকরা। চরে যাওয়ার রাস্তাও বেহাল। চর থেকে উপজেলা সদরে যেতে ইঞ্জিনচালিত নৌকাই একমাত্র ভরসা। নদীর পাড়ে পৌঁছাতে হয় আঁকাবাঁকা ফসলি জমির আইল পেরিয়ে।
এমন চরে শিক্ষার হাল কেমন, তা বলাই বাহুল্য। স্কুলে যেতে হলে পার হতে হয় দুটি শাখা নদী। তাই স্কুলে যায় না বেশিরভাগ শিশুশিক্ষার্থী। চরের জেলে তামিমের আক্ষেপ স্পষ্ট, ‘স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করমু। স্কুল না থাকায় করতে পারি নাই। এখন মাছ ধইরা সংসার চালাই।’ আরেক জেলে সাব্বিরের কষ্ট সন্তানদের নিয়ে, ‘ভালো একটা স্কুল না থাকায় পোলাপান লেখাপড়া করাইতে পারি না।’
এদিকে সন্তানদের পড়াশোনা করানোর আগ্রহ থাকলেও নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে দূরের স্কুলে যাওয়া তাদের জন্য কষ্টসাধ্য। এমনটাই জানালেন স্থানীয়রা। তাদের বক্তব্য, ‘কারেন্ট না থাকায় আমাগো চরে হুজুররা থাকতে চান না। এ কারণে পোলাপানরে লেখাপড়া করাইতে পারি না।’
‘এখানে আইসি দুই মাস হইছে। কিন্তু কারেন্ট নাই। আমি এখানে থাকতে পারব না। এভাবে কারেন্ট না থাকলে কি থাকা যায় বলেন?’ নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরলেন চরের মসজিদের ইমাম মো. আলমগীর হোসেন।
বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু শিক্ষাতেই নয়, এর প্রভাব পড়েছে সব ঘরে। ৭০ বছর বয়সী মারুফ আকনের আক্ষেপ, ‘নদীভাঙার কারণে এপার থেকে ওপার, ওপার থেকে এপার হইলাম। কিন্তু কারেন্টের মুখ আর দেখলাম না। ভালো একটা চিকিৎসা নিমু, তাও নিতে পারি নাই। এনে ডাক্তার নাই, হাসপাতাল নাই।’
বিয়ের সূত্রে চরে আসেন নাবিলা জাহান। বিদ্যুৎ না থাকার অভিজ্ঞতা তার কাছে নতুন, ‘বউ সেজে আসার পরে দেখি এই চরে কারেন্ট নাই। কষ্টের আর শেষ নাই। মাঝেমধ্যে একটু আরাম পেতে বাপের বাড়ি যাই।’
রহিমা আক্তারের অভিজ্ঞতা আরও দীর্ঘ, ‘বিয়ের পর থেকে এই এলাকায় কারেন্ট ও হাসপাতাল পাই নাই। চিকিৎসা করাইতে যাওয়া লাগে ৩০ কিলোমিটার দূরে দুইটা নদী পার হইয়া। সন্তানদের লেখাপড়া করাইতে পারি না। ভালো একটা স্কুল নাই, মাদ্রাসা নাই। এমনকি সুরা-কেরাত শিখাইমু, এই সুবিধাও নাই।’
‘আমরা এখানে থাকি শুধু জীবন বাঁচানোর লাইগা। ২৮ বছর ধইরা আমাদের এই চরে কারেন্ট নাই। সরকারের কাছে বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান পাই নাই’— বললেন এলাকার মাতবর রায়হান কবির।
বিদ্যুতের বিষয়ে চরজানাজাত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম রায়হান সরকার জানালেন পদক্ষেপের কথা, ‘এই সমস্যা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’ সেই উদ্যোগের কথা জানালেন শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান। বললেন, চরের ওই এলাকাটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। চরে সরকারি কোনো প্রকল্প এলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করব।’ ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ — বলে আশ্বাস জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তারের।
চরজানাজাতের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালার আশ্বাস, ‘যেকোনোভাবে তাদের এই বঞ্চনা থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে সব স্কুলে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চালু করা হবে। স্থাপন করা হবে নতুন মাদ্রাসা। পাশাপাশি কাঁচা সড়কগুলো পর্যায়ক্রমে পাকা করা, নদীশাসনের মাধ্যমে ভাঙন রোধ এবং চরজানাজাতের সঙ্গে শিবচরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।’






