গাজীপুর ও সাভারে উৎপাদনে ধস, ভারী লোকসানের বোঝা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ ঘাটতিতে ভোগান্তির অন্ত নেই গাজীপুর এবং পার্শ্ববর্তী ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায়। রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোয় নেমে এসেছে স্থবিরতা। আশঙ্কাজনক হারে কমছে উৎপাদন ও বিদেশি অর্ডার। পরিণতিতে বাড়ছে দেনা। এমতাবস্থায় কারখানা বন্ধ রেখে খরচ কিছুটা কমানোর চেষ্টায় শিল্প মালিকরা। এমনকি যেসব কারখানার অর্ডার কিছুটা কম, কাজের চাপও তেমন নেই, আবার গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট— সেগুলো বন্ধ।
গাজীপুর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চলগুলোর অন্যতম। এখানে রয়েছে কয়েক হাজার তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ওয়াশিং, সিরামিক, ওষুধ, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা। এসব কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে অপরিহার্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। এ দুটির সমস্যা হলে উৎপাদনসহ সার্বিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো।
গাজীপুরে কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ১৮৭টিতে উৎপাদন হয় পোশাক। যেখানে প্রয়োজন উচ্চচাপ ও গতির নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু জেলায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে গাজীপুর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি। এ কারণেই সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন।
গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী জেলখানা রোড এলাকার শামসুল আল আমিন গ্রুপের ফুয়াদ স্পিনিং মিলসের মহাব্যবস্থাপক হাবিবুল হাসানের অভিযোগ, গ্যাসের চাপ এতই কম যে, চালানো সম্ভব হচ্ছে না যন্ত্রগুলো। ১০ শতাংশ উৎপাদনও যদি না করতে পারি, তাহলে শুধু লোকসানই হবে।
বেশ কিছু দিন ধরে চলা তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে ফুয়াদ স্পিনিং মিলস ছাড়াও গাজীপুরের বেশ কিছু তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানার ডাইং (রঙ) সেকশন বন্ধ। এর বাইরে উৎপাদন আংশিক বন্ধ রেখেছে কিছু কারখানা। শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুরের লোহাকৈর এলাকার খান গ্রুপের কারখানায় সাধারণত প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজারটি পোশাক উৎপাদন হয়। সেটি এখন নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজারে। কারখানাটির কর্মকর্তা খন্দকার হাবিব জানালেন, গ্যাসসংকটে উৎপাদন সচল রাখতে এখন অধিক খরচে ব্যবহার করতে হচ্ছে ডিজেলচালিত জেনারেটর। এতে মাসিক জ্বালানি খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ডিজেল বাবদ ব্যয় ১২ লাখ টাকা।
গাজীপুরে তিতাস গ্যাসের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক মো. সাইফুজ্জামানের ভাষ্য, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি। এতে ভোগান্তিতে রয়েছে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো।
সাভার-আশুলিয়ায় উৎপাদনে ধস, বেড়েছে ব্যয়: তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের সাভার ও আশুলিয়া জোনাল বিক্রয় অফিসের তথ্য মতে, সাভার ও আশুলিয়ায় গ্যাসের সংযোগ রয়েছে ৭০৭টি শিল্পকারখানায়। এগুলোসহ এই এলাকার বাসাবাড়িতে দৈনিক ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা। তবে সপ্তাহখানেক আগে সরবরাহ ছিল মাত্র ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এখন কিছুটা উন্নতি হয়ে তা দাঁড়িয়েছে ১৩০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বলে অভিযোগ শিল্পকারখানার মালিকদের।
মুরাদ অ্যাপারেলস লিমিটেডের মালিক আবদুল হান্নানের আক্ষেপ, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট তীব্র হতে থাকায় দিন দিন বাড়ছে শিল্পকারখানার ব্যয়। এতে অলস বসে থাকছেন শ্রমিকরা, ক্রমেই ভারী হচ্ছে লোকসানের বোঝা।’ আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি জানালেন কালাম ফ্যাশনের মালিক আবু কালাম। গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বন্ধ রেখেছেন কলকারখানা। সাধারণ ছুটি দিলেও শ্রমিকদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ তো মেটাতেই হবে। এভাবে দুই মাসে ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তার দাবি।
অন্যদিকে সাভারের তেঁতুলঝড়া ইউনিয়নের হরিণধরা এলাকায় বিসিক চামড়া শিল্প নগরীতে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে। চামড়া শিল্পনগরীতে ১৪৫ কারখানার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বন্ধ রেখেছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। অন্যদিকে বাকি অর্ধেকে উৎপাদন কমেছে আশঙ্কাজনক হারে।
‘চামড়া প্রক্রিয়াজাতে প্রয়োজন গরম পানি। এতে শিল্পনগরীর কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ থাকতে হবে নিরবচ্ছিন্ন। কিন্তু বর্তমানে চাহিদার তুলনায় মিলছে প্রায় অর্ধেক। এতে ব্যাহত হচ্ছে কারখানায় উৎপাদন’— দুর্দশা তুলে ধরলেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান।
তিতাসের সাভার জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ হাসান আল মামুন জানালেন, পোশাক কারখানায় চাহিদার তুলনায় যে পরিমাণ গ্যাসের জোগান রয়েছে, তা প্রায় অর্ধেক। আর চামড়া শিল্পনগরীতেও দেওয়া হচ্ছে একই হারে। জোগান না বাড়া পর্যন্ত উন্নতি হচ্ছে না পরিস্থিতির।
তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তা জানেন না তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের সাভার আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম।






