হবিগঞ্জে গুদামে আছে সার, বাজারে নেই
- বিভিন্ন জেলায় চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষক, দামও বেশি। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি পরিবেশকদের। তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ডিলারদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুচরা বাজারে বাড়তি দাম দিলেই মিলছে। প্রতি বস্তায় ২০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি হিসাবে আমন মৌসুমের চাহিদার প্রায় পুরোটাই মজুদ রয়েছে। তবু হবিগঞ্জের বাজারে মিলছে না সার। কোথাও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ডিলারের নির্ধারিত এলাকায় সার বিক্রি না করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া, গুদামপর্যায়ে অনিয়ম ও পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। একই চিত্র জেলার ৯ উপজেলায়।
জেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির ইউনিয়নভিত্তিক সার ডিলার ১৫৭ এবং খুচরা বিক্রেতা ৭৬৫ জন। ৯২ হাজার ৫ হেক্টর আমন আবাদের জন্য সারের চাহিদা ১৯ হাজার ৯৪০ টন। বিপরীতে গুদামে মজুদ রয়েছে ১৮ হাজার ৩৬১ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, এক হাজার টনের মতো ঘাটতিকে সার সংকট বলা যায় না। তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না।
বানিয়াচংয়ের খাগাউড়া ইউনিয়নে বিসিআইসির ডিলার তানজীল ট্রেডার্সের সার বিক্রির কথা সাদতপুর বাজারে। কিন্তু দোকানটি রয়েছে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আলমপুরে। ফলে খাগাউড়ার কৃষকদের প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বেশিরভাগ ডিলারের ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এক এলাকার সার অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছে এবং সংকট বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়ার বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০, এমওপি ১ হাজার এবং টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অথচ কালোবাজারে এগুলো বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ১ হাজার ৫০০, ১ হাজার ৪৫০, ১ হাজার ১০০ ও ১ হাজার ৪৫০ টাকায়।
খাগাউড়ার কৃষক আওলাদ আলী বলেছেন, ২৫ বিঘা জমিতে আমন রোপণ শেষ করেছেন। কয়েক দিনের মধ্যে তার আট বস্তা ইউরিয়া প্রয়োজন। স্থানীয় ডিলারের কাছে না পেয়ে দুদিন ঘুরেও সার পাননি। শেষ পর্যন্ত বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা বেশি দামে সার কেনার চুক্তি করেছেন তিনি। বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ৩০ কৃষকের সঙ্গেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বানিয়াচং উপজেলার কৃষক দেওয়ান শোয়েব রাজা বললেন, তাদের আটকে রাখা হচ্ছে দুর্নীতির কালোবাজারে। এভাবে কৃষির বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতির লাগাম না টানলে একসময় এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৮ হাজার ২০০ টন ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে মজুদ রয়েছে ৭ হাজার ৬৪২ টন। টিএসপির চাহিদা ১ হাজার ৮৫০ এবং মজুদ ২ হাজার ৬২৯ টন। এমওপির চাহিদা ৩ হাজার ৩০০ এবং ডিএপির ৫ হাজার ৫০০ টনের বিপরীতে মজুদ রয়েছে ৫ হাজার ৪১ টন।
এক ডিলারের অভিযোগ, সরকার বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা মুনাফা নির্ধারণ করলেও গুদাম থেকে ভালো মানের সার নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। পরিবহন ও দোকান পরিচালনার খরচ বাদ দিলে নির্ধারিত মুনাফা থাকে না। তার মতে, ডিলারদের ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত ও বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা জরুরি।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক ডিলার আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করি। দিন শেষে ছয় মাসে লাভ পাওয়া যায় না ২০ হাজার টাকাও। ডিলারদের দুর্নীতির লাগাম টানতে আগে তাদের উপযুক্ত মুনাফা নিশ্চিত করতে হবে। বিতরণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা দরকার।’
সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ জহিরুল হকের ভাষ্য, এখনই দুর্নীতির লাগাম না টানলে পরে ক্ষতি ঠেকানো যাবে না।
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দ্বীপ কুমার পাল বলেছেন, নির্ধারিত এলাকায় সার বিক্রি নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়ানো হবে। বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






