‘বাবা কোথায় চলে গেলি বাবারে, তুই জিনিস কিনবি বইলে একদিন থাকলি’

দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবার। মেয়ে পাখি ছাড়া মারা গেছে সবাই। ছবি: সংগৃহীত
‘বাবা কোথায় চলে গেলি বাবারে!... তুই জিনিস কিনবি বইলে একদিন থাকলি বাবা! আজ জিনিস নিয়া কী হবে! জিনিসের দরকার নাই তো... তোমারে পাইলাম না।’
কলকাতার নিউ মার্কেটের একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে সপরিবারে নিহত হয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। সন্তান, তার স্ত্রী ও নাতির শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা স্বপ্না দত্ত।
মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ ও কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। যে বাড়িতে একসময় হাসি, কান্না আর স্বপ্নে দিন কাটত, সেখানে এখন নেমে এসেছে গভীর শোক।
পরিবার জানায়, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে কলকাতার ওই হোটেলে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি এবং আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক দেবাশীষ দত্ত (৪০), তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৯), তিন বছরের একমাত্র ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর মো. আকরাম হোসেন (৬৪)। একই পরিবারের চার সদস্যের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক মহল, স্বজন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
স্বজনদের ভাষ্য, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন দেবাশীষ। তার আয়ের ওপরই নির্ভর করত পুরো পরিবার। বাবা দিলীপ দত্ত ও অসুস্থ মা স্বপ্না দত্তের চিকিৎসা, সংসারের খরচসহ পরিবারের সব দায়িত্ব সামলাতেন তিনি। স্বজন ও সহকর্মীদের কাছে অমায়িক ও পরোপকারী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন দেবাশীষ।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত জানান, গত ৩ আগস্ট চিকিৎসার উদ্দেশ্যে স্ত্রী, একমাত্র ছেলে ও শ্বশুরকে নিয়ে ভারতে যান দেবাশীষ। প্রথমে বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হাসপাতালে স্ত্রীকে চিকিৎসা করানো এবং ছেলের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর কথা ছিল। এরপর শ্বশুরকে নিয়ে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বড় কোনো রোগ ধরা পড়েনি। চিকিৎসা শেষে গত ১৮ আগস্ট রাতে বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতায় ফেরেন তারা। এরপর নিউ মার্কেটের একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন সবাই।
পরদিন সকালে তাদের কুষ্টিয়ায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। হোটেলের সেই আগুনে শেষ হয়ে যায় একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।
ঘটনার আগের রাতেও রাত ৯টার দিকে বাবা দিলীপ দত্তের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছিল দেবাশীষের। তখন তিনি দেখছিলেন, লাগেজ গোছাচ্ছেন ছেলে আর খেলাধুলা করছে নাতি শর্ণশীষ। দেশে ফেরার আগে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করেছিলেন দেবাশীষ। কিনেছিলেন মেয়ে দেবানীতা দত্ত পাখির পছন্দের জিনিসও। ভিডিও কলে বাবাকে সেসবই দেখিয়েছিলেন দেবাশীষ। কে জানত, সেই সাজানো লাগেজ আর উপহারই হয়ে থাকবে পরিবারের শেষ স্মৃতি।
এদিকে কুষ্টিয়ার বাড়িতে থাকা দেবাশীষের আট বছরের মেয়ে দেবানীতা দত্ত পাখি এ যাত্রায় রক্ষা পেয়েছে। বাবা, মা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ভারতে যায়নি সে। নিষ্পাপ শিশুটি এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না, তার বাবা, মা ও ছোট ভাই আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।
শোকে আচ্ছন্ন দিলীপ দত্ত বলেন, ‘আমার পরিবারে আমার ছেলে গেছে, বেটার বউ গেছে আর নাতি গেছে... একমাত্র আছে পাখি, ও ছাড়া কেউ রইল না আমাদের। ওরা (দেবাশীষরা) আজকে আসত, শুক্রবার ওর মাকে নিয়ে রাজশাহীতে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার কথা ছিল। ও যে কত ভালো, কত পরোপকারী মানুষ ছিল, তা যে মিশেছে সেই বুঝতে পারবে। এভাবে হারিয়ে যাবে আমরা ভাবতে পারিনি।’
চিকিৎসার আশা নিয়ে ভারতে গিয়ে একটি হাসিখুশি পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না স্বজন, সহকর্মী ও প্রতিবেশীরাও। সহকর্মীদের কাছে দেবাশীষ ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ গণমাধ্যমকর্মী। তার অকালমৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে শোক।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় ওয়েলফেয়ার কমিটি বলছে, কলকাতার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে মোট নয়জনের। তাদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশের নাগরিক এবং একজন ভারতীয়।








