পদ্মায় বাসডুবি
খামতি নেই নিয়মের, অভাব শুধু প্রয়োগের

গত ২৫ মার্চ সৌহার্দ্য পরিবহন বাস পদ্মায় ডুবে (বাঁয়ে)। আজ ‘এসবি পরিবহন’ নদীতে পড়ে (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আড়াই মাসের ব্যবধানে আবারও যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়েছে। এ ঘটনায় যাত্রী, চালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
তবে এবার বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে, কারণ ফেরিতে ওঠার আগেই বাসটির অধিকাংশ যাত্রী নেমে গিয়েছিলেন। কিন্তু একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হওয়ায় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ‘এসবি পরিবহন’-এর একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই ঘাট এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এরপরই স্থানীয় লোকজন, ফেরিঘাট কর্মচারী ও নৌপুলিশ দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।
পরে খবর পেয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নদীর তলদেশ থেকে উদ্ধার করা হয় বাসটি।
দুর্ঘটনার সময় বাসে চালক, হেলপার ও সুপারভাইজার ছিলেন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাসে কোনো যাত্রী না থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বিআইডব্লিউটিসির সহকারী ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরেই নিয়ম রয়েছে যাত্রী নামিয়ে ফেরিতে বাস তোলার। সাম্প্রতিক সময়ে বাসডুবির ঘটনার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক বাসচালক প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়ম এড়িয়ে যাত্রীসহ ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে যাত্রীদের।
‘বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানের নির্দেশে সম্প্রতি দৌলতদিয়ার ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাটে নিরাপত্তা ব্যারিয়ার স্থাপন করা হয়েছে’—যোগ করেন সালাহউদ্দিন ।
সৌহার্দ্য ট্রাজেডি স্মৃতি এখনো তাজা
এই দুর্ঘটনা নতুন নয়, মাত্র আড়াই মাস আগে একই ফেরিঘাটে ঘটেছিল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর পন্টুনে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার সময় পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। ওই ঘটনায় ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই শোক কাটতে না কাটতেই আবার একই ধরনের দুর্ঘটনা জনমনে নতুন করে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।
পদ্মায় মর্মান্তিক বাসডুবির ঘটনায় দেশ জুড়ে উদ্বেগ ও শোকে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও বাস্তবে এই ফেরিঘাটে আসেনি কোনো পরিবর্তন। নির্দেশনা থাকলেও যাত্রী নামানো ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে উঠছেন বাসচালকরা। নিয়ম মানতে অনীহা অনেক যাত্রীরও।
নিয়ম আছে, বাস্তবায়ন নেই
দুর্ঘটনার পর বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ পরিদর্শনে এসে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীবাহী বাস থেকে সব যাত্রী নামিয়ে দিতে হবে। শুধু চালক গাড়ি নিয়ে ফেরিতে উঠবেন এবং যাত্রীরা হেঁটে ফেরিতে উঠবেন।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। দৌলতদিয়ার বিভিন্ন ঘাটে অনেক বাস এখনো যাত্রী নিয়েই ফেরিতে উঠছে। কিছু ক্ষেত্রে নৌপুলিশ যাত্রীদের নামতে বললেও অনেকেই তা উপেক্ষা করছেন।
৭ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় থাকা কয়েকটি বাস ও ট্রাক সরাসরি ফেরিতে উঠছে। দায়িত্বে থাকা নৌপুলিশ সদস্যরা যাত্রীদের নামতে অনুরোধ করলেও অনেকেই বাসের ভেতরেই অবস্থান করছেন।
যা বলছেন যাত্রীরা
পরিবারসহ ঢাকায় যাচ্ছিলেন রহিম। বললেন, ‘বাস থেকে আমাদের কিছুই বলা হয়নি। আমি নিজেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিরাপত্তার জন্য নেমে এসেছি। প্রত্যেক যাত্রীরই নিজের উদ্যোগে এভাবে নেমে ফেরিতে ওঠা উচিত।’
আরেক যাত্রী ইয়াসমিনের ভাষ্য, ‘আমাদের মধ্যে কয়েকজন নেমেছি, কিন্তু অধিকাংশ যাত্রী বাসেই রয়েছে। নিজেদেরও সতর্ক হতে হবে। চালকের একটি ভুলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক সময় নতুন হেলপারদের হাতে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়, সেখান থেকেও ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই আমরা বাস থেকে নেমে এসেছি।’
কী বলছেন বাসচালকরা
বাস থেকে নামার ক্ষেত্রে যাত্রীদের গাফিলতিকে দায়ী করছেন বাসচালকরা। রাজধানী এক্সপ্রেসের চালক রাসেলসহ কয়েকজন চালক জানালেন, যাত্রীদের বারবার নামতে বলা হলেও অনেকেই পরিবার ও শিশুদের নিয়ে গরমের কারণে বাসে থাকতে চান। তাদের ফেরি থেকে নেমে আবার বাসে ওঠার কথা বলা হলেও অনেকেই নির্দেশনা মানেন না।
চালকদের ভাষ্য, ফেরিতে ওঠা-নামার রাস্তা অতিরিক্ত ঢালু হওয়ায় যানবাহনের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ব্রেকে সামান্য ত্রুটি থাকলেও তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তারা পন্টুনের ব্যারিকেড ও নিরাপত্তা রেলিং আরও উঁচু করার দাবি চালকদের।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ ঝাড়লেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, ফেরিঘাট এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং পন্টুনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাবের কারণে বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে শিথিলতা রয়েছে, নিয়ম না মানলে শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। তদারকির অভাবও স্পষ্ট।
নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান ঘাটসংশ্লিষ্টদের। তাদের ভাষ্য, শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ফেরিতে ওঠার আগে বাধ্যতামূলকভাবে যাত্রী নামানো, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা রেলিং স্থাপন, ঢালু রাস্তা সংস্কার, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি। তবেই এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।







