বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরী
জরা ভবন জীর্ণ উৎপাদন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেছে বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার। এই সময়ে শিল্পনগরীকে ঘিরে নানা সম্ভাবনার কথা বলা হলেও প্রত্যাশিত উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি বাস্তবে। বরং প্রশাসনিক ভবনের জীর্ণ অবস্থা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কাঁচামালের সংকট মিলিয়ে শিল্পনগরী এখন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, সেবা নিতে আসা উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদেরও একই ঝুঁকি নিয়ে করতে হচ্ছে আসা-যাওয়া।
বাগেরহাট শহরের ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রশাসনিক ভবনটি নির্মিত হয় ১৯৯৫ সালে। প্রায় ৩১ বছর ধরে ব্যবহৃত ভবনটি দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ব্যবহার অনুপযোগী। বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের ফাটল, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া, ছাদের ক্ষয় এবং লোহার কাঠামোয় মরিচা দেখা যায় স্পষ্টভাবে। শুধু দৃশ্যমান ক্ষয় নয়, ভবনটির নিরাপত্তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগ।
উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামাল সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান পড়েছে আর্থিক ক্ষতির মুখে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও পড়েছে অনিশ্চয়তায়।
শিল্প উদ্যোক্তা আব্দুল হালিমের ভাষায়, প্রশাসনিক ভবনে কাজ করতে এলেই ভয় লাগে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি কাঁচামালের সংকট দূর করা প্রয়োজন।
আরেক উদ্যোক্তার বক্তব্যে উঠে এসেছে শিল্পনগরীর আরও বিস্তৃত সমস্যার চিত্র। উদ্যোক্তা মো. শহিদুল ইসলাম মনে করেন, শিল্পনগরীর সার্বিক পরিবেশ এখন আর বিনিয়োগবান্ধব নেই। পানি সংকট, জীর্ণ প্রশাসনিক ভবন এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যায় উদ্যোক্তারা পড়ছেন ভোগান্তিতে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে শিল্প খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নিরুৎসাহিত হবে নতুন বিনিয়োগ।
বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, সম্প্রতি ভবনটি পরিদর্শন করেছেন বিসিকের প্রধান প্রকৌশলী। জেলা কনডেমনেশন কমিটির মাধ্যমে ভবনটিকে কনডেম (ব্যবহারের অনুপযোগী) ঘোষণার নির্দেশনাও দিয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা না হওয়ায় এখানেই পরিচালিত হচ্ছে সব কার্যক্রম। ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দাপ্তরিক কাজ করছেন সেখানে। পাশাপাশি জেলার প্রায় ৫২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন উপজেলার সেবাগ্রহীতারা নিয়মিত আসছেন এই ভবনে। প্রশাসনিক ভবনের এই বাস্তবতার পাশাপাশি শিল্পনগরীর সামগ্রিক চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
উপকূলীয় এলাকার বাতাস ও মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে পুরনো ভবনে দেখা দিয়েছে ফাটল: মো. সোহাগ হোসেন, উপব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত), বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরী
১৯৯৬ সালে প্রায় ২১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীতে ১২৩টি শিল্প প্লটের সবই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এখানে রয়েছে ৫২টি শিল্প ইউনিট, যার মধ্যে ৪৩টি চালু। দুটি নারিকেল তেলের মিল পুরোপুরি বন্ধ। কাঁচামাল সংকটে অন্য তেলের মিলগুলোও সীমিত পরিসরে চালিয়ে যাচ্ছে উৎপাদন। শিল্পনগরীতে নারিকেল তেল, অটো রাইস ও ফ্লাওয়ার মিল, সরিষা ও ডাল মিল, ইজিবাইক অ্যাসেম্বলিং, পুরনো প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কোকোনাট ফাইবার মিলসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রয়েছে পল্লী বিদ্যুতের একটি উপকেন্দ্র। তবে বিদ্যুৎ সুবিধা থাকলেও উৎপাদন ধরে রাখা এখন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অবশ্য এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে বিসিক কর্তৃপক্ষ। তারা জানায়, গত পাঁচ বছরে সংস্কার করা হয়েছে শিল্পনগরীর প্রায় সব অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেনের। বর্তমানে প্রায় ৪০০ ফুট রাস্তা ও ড্রেনের কাজ বাকি, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে একটি সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনের কাজও চলছে। এজন্য উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় না পানির বিল।
তবে প্রশাসনিক ভবনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষও সমস্যার গুরুত্ব অস্বীকার করছে না। বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সোহাগ হোসেনের ভাষ্য, উপকূলীয় এলাকার বাতাস ও মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে এখানকার প্রায় সব পুরনো ভবনেই দেখা দিয়েছে ফাটল। প্রশাসনিক ভবনটিও একই সমস্যার মুখোমুখি। বিষয়টি জানানো হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।
নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প ও প্রাক্কলন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ার আশা করছেন এই কর্মকর্তা।
সোহাগ হোসেন উল্লেখ করেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে শিল্পনগরীর অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেন উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে। তবে সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ প্রয়োজন।





