পর্যটকের মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে প্যারাসেইলিংয়ের ভয়াবহ অনিয়ম

কক্সবাজারের প্যারাসেইলিং পয়েন্ট— আগামীর সময়
কক্সবাজারের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আকাশ থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়ে খুলনার পর্যটক অক্ষর শৌভিক রায় (৩০)। এ ঘটনায় মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর পরই আবারও সামনে এসেছে উপকূলীয় পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ প্যারাসেইলিংয়ের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কার্যকর তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল এই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রম।
স্থানীয় সূত্র ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে একই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে সাগরে পড়ে, ঝাউবাগানে আটকে কিংবা বালুচরে আছড়ে পড়ে আহত হয়েছেন অন্তত ১৯ পর্যটক। এরপরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি।
গত শনিবার দরিয়ানগর সৈকতে ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’-এর একটি রাইডে অংশ নিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন অক্ষর শৌভিক রায়। অভিযোগ রয়েছে, বৈরী আবহাওয়ায় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক আত্মগোপনে চলে যান এবং প্রশাসন প্যারাসেইলিংয়ের যন্ত্রপাতি জব্দ করে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই অক্ষরের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহত পর্যটকের বোন মেধা মৃতি রায় আজ রবিবার কক্সবাজার সদর থানায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘অবৈধভাবে প্যারাসেইলিং যে হচ্ছিল, সেটা নিয়ে প্রশাসনের কেন কোনো নজরদারি নেই?’
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, মামলাটি টুরিস্ট পুলিশ তদন্ত করবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের দরিয়ানগর, হিমছড়ি ও প্যাঁচারদ্বীপ এলাকায় তিনটি প্রতিষ্ঠান প্যারাসেইলিং পরিচালনা করলেও কোনো প্রতিষ্ঠানেরই এ ধরনের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না। জেলা প্রশাসনের ইজারার আওতায় সৈকতে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পেলেও বেসামরিক বিমান চলাচল, নিরাপত্তা মান, উদ্ধার সক্ষমতা কিংবা কারিগরি অনুমোদনের শর্ত তারা পূরণ করেনি।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, ‘কক্সবাজারে কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করছে না। প্রশাসন একাধিকবার অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করলেও তারা গোপনে আবার চালু করেছে।’
তিনি জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত ২৭ জুলাই থেকেই দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করেই শনিবার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দুর্ঘটনার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্যারাসেইলিংয়ের সব সরঞ্জাম জব্দ করেছেন। যন্ত্রপাতি ও কাগজপত্র পরীক্ষা শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষ্য, গত এক দশকে শুধু ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টসের প্যারাসেইলিং থেকেই অন্তত ১৯ জন পর্যটক বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন। কেউ রশি ছিঁড়ে সমুদ্রে পড়েছেন, কেউ লাইফ জ্যাকেটের হুক খুলে পানিতে পড়ে গেছেন, কেউ ঝাউবাগানের গাছের ডগায় আটকে থেকেছেন, আবার কেউ আকাশ থেকে বালুচরে আছড়ে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট এক নারী পর্যটক রশি ছিঁড়ে সমুদ্রে পড়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান। একই মাসে আরেক নারী পর্যটক ঝাউবাগানের গাছে আটকে যান। গাছ থেকে উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থাও সেখানে ছিল না। ওই ঘটনার পরদিন প্রশাসন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করলেও কিছুদিন পর তা আবার চালু হয়। এরও আগে ২০২৫ সালের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে আরেক পর্যটক প্যারাসেইলিং থেকে সমুদ্রে পড়ে গুরুতর আহত হন। চলতি বছরের জুলাই মাসেও উড্ডয়নের সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকজন নারী ও শিশুসহ অন্তত চার থেকে পাঁচজন পর্যটক আহত হন।
এ বিষয়ে কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বললেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্যারাসেইলিংকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এটি পরিচালনায় শুধু ব্যবসার লাইসেন্স নয়, বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োজন হয় প্রশিক্ষিত অপারেটর, নিয়মিত যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম, জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন।’
তার ভাষ্য, কক্সবাজারে এসব শর্তের অধিকাংশই মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কোনো অনুমোদন নেই, নেই জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। সমুদ্রে দুর্ঘটনা ঘটলে এখনো চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি এনে উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেছেন, ‘সৈকতে প্যারাসেইলিং পরিচালনার বিষয়ে কেউ ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেয়নি। সমুদ্রে কেউ নিখোঁজ হলে আমাদের নিজস্ব ডুবুরি নেই। ডুবুরি চট্টগ্রাম থেকে আনতে হয়।’
পর্যটকদের অভিযোগ, বৈরী আবহাওয়ায় প্যারাসেইলিং নিরাপদ কি না, সে বিষয়ে কোনো সতর্কতা দেওয়া হয় না। বরং রোমাঞ্চের প্রলোভন দেখিয়ে পর্যটকদের উৎসাহিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাই, নিরাপত্তা ব্রিফিং কিংবা সরঞ্জাম পরীক্ষা ছাড়াই রাইড পরিচালনা করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, লক্কড়ঝক্কড় স্পিডবোট, পুরনো সরঞ্জাম এবং অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম পরিচালিত হলেও কার্যকর নজরদারি ছিল না।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টুয়াক) উপদেষ্টা মফিজুর রহমান বললেন, ‘প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রশাসন বারবার বন্ধ করলেও কিছু ব্যবসায়ী লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়েই কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দুর্ঘটনার পরও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।’
টুয়াক সভাপতি আনোয়ার কামালের মতে, ‘কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং অবশ্যই থাকা উচিত। তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। প্রশিক্ষিত জনবল ও নিরাপদ যন্ত্রপাতি ছাড়া এই কার্যক্রম পর্যটনশিল্পের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।’
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘দরিয়ানগরসহ বিভিন্ন সৈকতে বছরের পর বছর নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্যারাসেইলিং চলছে। দুর্ঘটনা ঘটলেই কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করা হয়, এরপর আবার আগের মতো শুরু হয়। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত অপারেটর, উদ্ধার নৌযান বা প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকলেও ব্যবসা চলেছে। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে দায় নিতে কেউ আসে না।’





