বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস
সংগ্রাম থেকে সাফল্য, সম্মাননা পেলেন বরেন্দ্রের ২২ গ্রামীণ নারী

ছবি: আগামীর সময়
একসময় সংসারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতেন কবুলজান। সেই সংগ্রাম থেকেই শুরু তার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ২০১৩ সাল থেকে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি করছেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার চুলা তৈরি করে দিয়েছেন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে। পাশাপাশি কাজ করছেন জৈব সার, জৈব বালাইনাশক, শাকসবজি ও ঔষধি গাছ নিয়ে। তার মতো বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক নারী নিজেদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বদলে দিচ্ছেন পরিবার ও সমাজের চিত্র।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। এ উপলক্ষে রাজশাহী অঞ্চলের এমন ২২ সংগ্রামী নারীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। কৃষি, দেশি বীজ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
আজ বুধবার দুপুরে ‘গ্রামীণ নারীর উত্থান: সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ প্রতিপাদ্যে রাজশাহীর পবা উপজেলার বিল নেপালপাড়া গ্রামের এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সম্মাননা পাওয়া নারীরা পবা ও তানোরের পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল এলাকার বাসিন্দা।
সংবর্ধনা পাওয়া কবুলজান বলেছেন, ‘একসময় সংসারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতাম। কখনো ভাবিনি, আমার ছোট ছোট উদ্যোগ একদিন এত মানুষের উপকারে আসবে।’
তার লক্ষ্য রান্নার ধোঁয়া কমানো, নারীদের শ্বাসকষ্ট ও চোখের সমস্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষা। প্রায় ৫০টি গ্রামে ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজের উদ্যোগ। তিনি চান, গ্রামের নারীরাও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হোন।
দেশি বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন পবার তেতুলিয়াডাঙ্গার পান্না বেগম। তিনি ৪০ ধরনের বীজ সংরক্ষণ করেছেন এবং তিনটি গ্রামের ৭৯ জন নারীর মধ্যে বীজ বিনিময় করেছেন। তানোরের জগদিশপুরের সেতারা বেগম পাঁচ গ্রামের ১৪৫ জন নারীর মধ্যে ২১ জাতের সবজির বীজ বিনিময় করেছেন। নিজের বাড়িতে সংরক্ষণ করছেন ৪৯ প্রজাতির সবজি ও ঔষধি গাছের বীজ।
একই এলাকার মার্জিনা টুডু ৪৭ জাতের বীজ সংগ্রহ করেছেন। ১০টি গ্রামের ১৭৫ জন নারীর মধ্যে বীজ বিনিময়ের পাশাপাশি ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি ও ব্যবহারে কাজ করছেন তিনি। নিজের আয় দিয়ে সংসার পরিচালনার পাশাপাশি একটি খাসপুকুরের ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করতেও ভূমিকা রেখেছেন।
পবার তালুকধর্মপুরের শিল্পি বেগমের বাড়িতে পাঁচ জাতের ২৩০টি প্রাণিসম্পদ রয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ২৫ ধরনের বীজ বিনিময় করেছেন ৯০ জনের মধ্যে। পবার দিঘীপাড়ার আয়েশা বেগম বরেন্দ্র অঞ্চলের উপযোগী ১৪ জাতের কলার বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বিনিময় করছেন। একই এলাকার মরজিনা বেগম ছাদে ১৫ প্রজাতির সবজি চাষ ও বীজ সংরক্ষণ করছেন। বিল ধর্মপুরের মাহমুদা বেগম গ্রামের ৪৫ জন নারীর সঙ্গে ১৫ জাতের বীজ বিনিময় করেছেন।
তানোরের গোকুল-মাথুরার অঞ্জলি রানী ১৫ জাতের সবজির বীজ ৪৫ জন নারীর মধ্যে বিনিময় করেছেন। থানতলার পানি মার্ডি বাড়িতে বৈচিত্র্যময় সবজি চাষের পাশাপাশি আদিবাসী নারীদের উৎসাহিত করছেন এবং নারী সংগঠন গড়ে তুলতে কাজ করছেন।
প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায়ও অবদান রাখছেন নারীরা। পবার বিল নেপালপাড়ার মিনারা বেগম ছয় গ্রামের ১২০ জন নারীকে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি করে দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভেষজ চিকিৎসাসেবা দেন। তানোরের বাগিশোরের তিসি সরেন দেশি বীজ সংরক্ষণ, ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি ও জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন। নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেছেন এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার।
তানোরের সিন্ধুকাইয়ের মাইনো বাসকি কৃষিকাজের পাশাপাশি পুকুরে শামুক চাষ করেন। আগে দূরের বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করতে হতো। এখন পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশেই শামুক বেড়ে ওঠে। আলাদা খাবার দিতে হয় না। মাসে দুই থেকে তিনবার শামুক তুলে পরিবারের খাদ্যচাহিদা মেটান তারা। মাইনো বাসকি বললেন, তাদের গ্রামে প্রায় ৪৫টি পরিবারের প্রায় ১৫০ জন শামুক খেয়ে জীবন-ধারণ করে থাকেন।
তানোরের চাপড়া গ্রামের সেলিনা বেগম নিজের পুকুরে দেশি মাছের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করছেন। পাশাপাশি ১৫ জাতের দেশি ফল চাষ করছেন। একই উপজেলার সিন্ধুকাইয়ের পরি টুডু প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে স্বল্প জমিতে বৈচিত্র্যময় খাদ্য উৎপাদন করছেন। জৈব পদ্ধতিতে সবজি চাষের মাধ্যমে বর্জ্যকে কৃষির কাজে লাগাচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের আভাইড় এলাকার তহমিনা বেগম ও শাহানা বেগম দেশি বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের পাশাপাশি জৈব বালাইনাশক তৈরির পদ্ধতি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ১২টি গ্রামের ২০০ জন নারীকে এ পদ্ধতি শিখিয়েছেন তারা। তানোরের সেনালাপুরের সুমি বেগম কুটিরশিল্প ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছেন। পবার কারিগরপাড়ার বিলকিস বেগম ভার্মিকম্পোস্ট বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা আয় করেছেন। পবার দুয়ারি গ্রামের জেসমিন বেগম বৈচিত্র্যময় সবজি চাষের পাশাপাশি ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি ও ব্যবহারে কাজ করছেন।
নদী গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবী গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী। যিনি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। তিনি বললেন, কৃষিতে নারীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ফসল ঘরে তোলা, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণ থেকে শুরু করে পরিবারের খাদ্য জোগানো পর্যন্ত তাদের শ্রম জড়িয়ে আছে। তার মতে, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেলে গ্রামীণ নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও অর্থনীতিতে আরও অবদান রাখতে পারেন।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক ও সমাজসেবক ওয়ালিউর রহমান বাবু। তিনি বললেন, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে নারীরাও নিজেদের যোগ্যতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারেন। তাদের কাজের স্বীকৃতি ও যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য দেয়া গ্রিন কোয়ালিশনের পবা উপজেলা সভাপতি রহিমা খাতুন বললেন, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কৃষিতে নারীদের অবদানের স্বীকৃতি ও উৎসাহ দিতেই এ সম্মাননার আয়োজন।
বারসিকের রাজশাহীর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের নারীরা খরা মোকাবিলা, দেশীয় ও খরাসহিষ্ণু বীজ সংরক্ষণ এবং নিরাপদ শাকসবজি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাদের লোকায়ত কৃষিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি কৃষিনীতি নির্ধারণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে পবা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকসহ প্রায় তিন শতাধিক গ্রামীণ কর্মজীবী নারী উপস্থিত ছিলেন।
বরেন্দ্র অঞ্চলের এসব নারীর উদ্যোগ শুধু পরিবারের আয় বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে সংরক্ষিত হচ্ছে দেশি বীজ ও প্রাণবৈচিত্র্য। ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা। তাদের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগ গ্রামীণ নারীর সক্ষমতা এবং টেকসই কৃষির সম্ভাবনাকে তুলে ধরছে।





