চাকরির নামে রাশিয়ায় নিয়ে বানানো হয় যুদ্ধের ‘টোপ’, নিহত ২০ বাংলাদেশি

ইউক্রেন ভূখণ্ডে উড়ছে রাশিয়ার ড্রোন। ফাইল ছবি: রয়টার্স
চাকরির কথা বলে তাদের নেওয়া হয়েছিল রাশিয়ায়; কিন্তু তাদের পাঠানো হলো ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা এমন ২০ বাংলাদেশির নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
আজ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জনশক্তি রপ্তানিকারক তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি যুবককে রাশিয়ায় পাঠানোর তথ্য জানানো হয়। এদের মধ্যে ২০ জন নিহত হন যুদ্ধক্ষেত্রে, দুজন দেশে ফিরেছেন যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে।
জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল বলে এসআরবি তথ্য পেয়েছে।
এদের মধ্যে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান এবং আবু তাহের লেন্টু নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বিদেশে যাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে ঋণ করেছিলেন তারা।
এ ঘটনায় মানব পাচারচক্রের অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। তাতে এ পর্যন্ত সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এই যুদ্ধে অন্যান্য দেশের নাগরিকদের অংশ নিতে গিয়ে প্রাণ হারানোর তথ্যও এসেছে।
নির্মাণকাজের জন্য গিয়ে সেনা ক্যাম্পে
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি বছরের ৭ মে তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি ‘ওয়ার্ক পারমিট ভিসা’য় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, তারা নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের আটকে ফেলা হয়।
প্রথমে স্থানীয় একটি হোটেলে আটকে রাখা হয় ওই বাংলাদেশিদের। তাদের পাসপোর্ট, মুঠোফোনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা তখন বুঝতে পারেন, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আকুতি-মিনতি করেও মুক্তি মেলেনি তাদের। সেনা ক্যাম্পে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এসআরবি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে যাদের নেওয়া হয়েছিল, তাদের কারও যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এরপরও মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।
তার ভাষ্য, প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে, তাদের প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার কাজে একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তাদের ওপর ড্রোন হামলা হলে সেই হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতো।
প্রথম দিনেই নিহত ১৭
এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক আসাদুজ্জামান বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ২০ জন মারা গেছেন। বাংলাদেশে ফিরে আসা দুজনের নাম রাজন ও আদনান। তারা দুজনই অত্যন্ত আহত ও মুমূর্ষু অবস্থায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
ফিরে আসা রাজনকে এখন ক্রাচ নিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। তার কাছ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের মোতায়েন ও হতাহতের বিষয়ে তথ্য পেয়েছে এসআরবি।
রাজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বাংলাদেশিকে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখ, মধ্য ও পেছনের অংশে তিন ভাগে মোতায়েন করা হয়েছিল। সম্মুখভাগে ১৬ জন, মধ্যভাগে ছয়জন এবং পেছনের অংশে আটজন ছিলেন। ড্রোন হামলায় সম্মুখভাগের ১২ জন, মধ্যভাগের চারজন এবং পেছনের অংশের চারজন নিহত হন।
যুদ্ধে যাওয়ার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন বলে রাজন জানিয়েছেন। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ জনে।
সংবাদ সম্মেলনে রাজনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আসাদুজ্জামান বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তার পিঠের ওপর ড্রোন আছড়ে পড়ায় কোমর ভেঙে যায়। একপর্যায়ে কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে আসতে থাকে। তখন পাশের একজনের ওয়াকিটকি ব্যবহার করে তাকে উদ্ধারের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু জবাব আসে, সেখান থেকে তাকে উদ্ধারের কোনো উপায় নেই।
পরে বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের একটি ক্যাম্পে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছান রাজন।




