রংপুরে চার খুন
মাছুয়াপাড়ায় পূজামণ্ডপে থাকবে বাড়তি নজরদারি

দক্ষিণ কামাল কাছনা (দাসপাড়া) কালিমন্দির। ছবি: আগামীর সময়
রংপুরে আলোচিত চার খুনের ঘটনার দেড় মাসেও মাছুয়াপাড়ায় আতঙ্ক কাটেনি। হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকায় দুর্গোৎসবেও পড়েছে ভাটা। প্রতি বছর একমাস আগে থেকে এলাকার মণ্ডপে প্রতিমা তৈরিসহ সাজসাজ রব উঠলেও এবারে সবার আনন্দ যেন মিলিয়ে গেছে। নিজেদের তৈরি নয়, বসানো হয়েছে কেনা প্রতিমা। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানকার পূজামণ্ডপে বাড়তি নজরদারির কথা বলা হয়েছে।
চার খুনের ঘটনার আগে আরও দুটি হত্যার ঘটনা ঘটে ওই মাছুয়াপাড়া এলাকায়। এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে মাদক ব্যবসা, আধিপত্য ও বিরোধের জের। এ কারণে ‘মাদকসেবী ও কারবারির আখড়া’ হিসেবেও এলাকাটি পরিচিত। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি মাছুয়াপাড়া সংলগ্ন তাঁতীপাড়ায় খুন হন অটোচালক আমিনুল ইসলাম (৩৫)। বিজয় মোহান্ত নামে এক মাদকাসক্ত ব্যক্তি গাঁজা কাটার ছুরি দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এরপর গত ১০ এপ্রিল মাছুয়াপাড়ায় পূর্ববিরোধের জেরে রাকিব হাসান (২০) নামে এক তরুণকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে রাকিবকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর মাছুয়াপাড়ায় দুটি বাড়ি ও ১০টি দোকানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। আতঙ্কে কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এসব ঘটনার রেশ না কাটতেই মাছুয়াপাড়াতেই ফের ঘটেছে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। গত ২২ আগস্ট সেখানে বসবাসরত অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাড়ির ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় শিক্ষকসহ একে একে তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন তারা। মামলাটি বর্তমানে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।
এ ঘটনায় দুজন গ্রেপ্তার হলেও মাদক কারবারিরা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ যার কাছে থেকে ইয়াবা কিনতেন, সেই মাদক কারবারি শান্ত দাস ঘটনার পর আত্মগোপনে থাকলেও হঠাৎ ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পুলিশ তাকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে নিয়ে জবানবন্দি নিয়েছেন। চিহ্নিত এ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্ন ওঠে।
সরেজমিন দেখা যায়, নিহত গণপতির বাড়িটি এখনো পুলিশ প্রহরায় রয়েছে। এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে নেই কোনো আয়োজন। একই পরিবারে চার খুনের ঘটনায় এখনো শোক কাটেনি অনেকের। আতঙ্কে কেউ কেউ স্বাভাবিক চলাফেরাও করতে পারছেন না।
মেনোকা দাস নামের এক গৃহবধু বললেন, ‘এতো বড় একটা ঘটনা, এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাই কী করে!’ সেই শোকে তাদের বাড়িতে এবার পূজার আয়োজন হয়নি বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শিবেন দাস বলেছেন, ‘এ্যালাও ভয় নাগে, কখন-কী হয়। মনোত শান্তি নাই, এবার পূজাও নাই।’
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের দক্ষিণ কামাল কাছনা (দাসপাড়া) কালিমন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রীকান্ত দাস জানান, প্রতি বছর এখানে প্রতিমা তৈরি করে জাকজমকভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। গণপতি চক্রবর্তীরও অবদান ছিল। কিন্তু এবারে সেই আনন্দে ভাটা পড়েছে, রয়েছে আতঙ্কও। শেষ পর্যন্ত মণ্ডপে এবারে কেনা প্রতিমা বসানো হয়েছে।
লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মাছুয়াপাড়ার কেউই মাদক কারবারিদের নাম-পরিচয় মুখে আনছেন না। এমনকি গণমাধ্যমের সঙ্গে মাদক সেবনকারী ও কারবারিদের বিষয়ে কথা বলতেও তাদের অনেককেই অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যায়। নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকজন জানান, মাছুয়াপাড়া ও আশপাশের কয়েকটি স্থানে রাত পর্যন্ত মাদক সেবন ও কেনাবেচা চলে। বিশেষ করে শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর দুই সেতুর আশপাশে সন্ধ্যার পর বাড়ে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা। রাতে ওই পথে চলাচল করতে ভয় পান স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, কামাল কাছনা, মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া, তাঁতীপাড়া, নূরপুরসহ আশপাশের এলাকায় গাঁজা বিক্রি হয়। কেউ কেউ ইয়াবাও বিক্রি করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু জানিয়েছেন, মাছুয়াপাড়ায় এর আগে সংঘটিত দুটি হত্যাকাণ্ডও ছিল মাদককেন্দ্রিক। ওই এলাকার ৯০ ভাগ পরিবার মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকি ১০ ভাগের একটি ছিল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি এ ব্যাপারটিতে গুরুত্ব দিত, তাহলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নাও ঘটতে পারত,’ বললেন তিনি।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী জানান, মাছুয়াপাড়ায় চার খুনের ঘটনার পর মাদক কারবারিরা গা ঢাকা দিয়েছে। তারপরও মাদকের এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার দুই আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল। এখনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে গতকাল রবিবার সকালে পূজামণ্ডপ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বললেন, ‘নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি সংলগ্ন পূজামণ্ডপে প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি থাকবে, যাতে সবাই নির্ভয়ে ও আনন্দমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব পালন করতে পারে।





