১৮ কোটির হাসপাতাল এখন সাপ-শিয়ালের বাসা

ছবি: আগামীর সময়
প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল। রয়েছে সুসজ্জিত ভবন, চিকিৎসা কক্ষ, আবাসিক কোয়ার্টার এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটিতে চালু হয়নি কোনো চিকিৎসাসেবা। জনবল, ওষুধ ও বাজেট সংকটে ভরা গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তালিয়া গ্রামের এই হাসপাতালটি।
এটি এখন স্থানীয়দের কাছে উন্নয়নের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাসেবার আশায় থাকা হাজারো মানুষ তাই দ্রুত হাসপাতালটি চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও পূর্বাচল নতুন শহরের লাগোয়া এলাকায় ২ দশমিক ৭৩ একর জমির ওপর নির্মিত হাসপাতালটি। এতে রয়েছে একটি মূল ভবন, তিনটি আবাসিক কোয়ার্টার, একটি জেনারেটর রুম, একটি গ্যারেজ ও একটি পাম্প হাউস।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের কক্ষগুলোতে চেয়ার-টেবিল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), এলইডি টেলিভিশনসহ রয়েছে বিভিন্ন সরঞ্জাম। তবে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ওষুধের অভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অচল। ভবনের চারপাশে ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠেছে বাসা বেঁধেছে শিয়াল ও সাপ। অনেক জায়গা কৃষিকাজে ব্যবহার করছেন স্থানীয়রা।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় হাসপাতালটির। প্রায় দুই বছর কাজ শেষে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর সম্পন্ন হয় নির্মাণকাজ। পরে ২০২১ সালের ২০ জুন গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয় হাসপাতালটি।
২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম চালুর। একই বছরের ডিসেম্বরে উদ্যোগ নেওয়া হয় জনবল নিয়োগের। প্রথমে ২৫টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হলেও ২০২৪ সালের মার্চে ১৬টি পদ অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। পরে ওই বছরের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি করা হয় পদগুলো।
তবে পদ সৃষ্টি হলেও কাটেনি জনবল সংকট। একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট এবং দুইজন নার্স পদায়ন করা হলেও বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন তারা। এখনো শূন্য রয়েছে বাকি ১২টি পদ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালটির জন্য এখনো অর্থনৈতিক কোড বরাদ্দ না হওয়ায় পাওয়া যাচ্ছে না কোনো বাজেট। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ওষুধ ক্রয়সহ প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি এখনো।
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন-অর-রশিদ বলেছেন, ‘প্রতি বছর হাসপাতাল চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। হাসপাতালটি চালু হলে এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়া অনেক সহজ হবে।’
স্থানীয় চিকিৎসক ডা. মো. ওমর কায়ছার বলেছেন, ‘বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি দীর্ঘদিন অচল থাকা হতাশাজনক। দ্রুত সেবা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।’
একই গ্রামের বাসিন্দা শিউলি বেগমের ভাষ্য, ‘অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের নিয়ে ঢাকায় যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। হাসপাতালটি চালু হলে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ অনেক কমবে।’
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসক পদায়ন থাকলেও অর্থনৈতিক কোড না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেছেন, জনবল, ওষুধ ও বাজেটসংক্রান্ত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে সমস্যাগুলোর সমাধান হচ্ছে এবং দ্রুত হাসপাতালটি চালুর বিষয়ে তারা আশাবাদী।





