নারায়ণগঞ্জে ডিপিডিসির ‘আধুনিক’ প্রিপেইড মিটারে ভোগান্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদ্যুৎব্যবস্থাকে আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব করতে নারায়ণগঞ্জে প্রিপেইড মিটার বসানো শুরু করেছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। কিন্তু নতুন মিটার স্বস্তি আনার বদলে অনেক গ্রাহকের কাছে হয়ে উঠেছে ভোগান্তির কারণ। রিচার্জে বিভিন্ন ধরনের চার্জ কেটে নেওয়া, সার্ভার জটিলতায় টাকা দিয়েও ব্যালান্স না পাওয়া, মিটার লক হয়ে গেলে দ্রুত কারিগরি সহায়তা না মেলা এবং ব্যালান্স শেষ হলেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়ে ক্ষুব্ধ নাগরিকদের একাংশ এর মধ্যে মিটার স্থাপন বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন।
সাধারণ গ্রাহক ও নাগরিক অধিকার ফোরামের নেতারা বলছেন, উন্নত সেবার বদলে প্রিপেইড মিটারে ভোগান্তি বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, আগাম নোটিস বা গণশুনানি ছাড়াই গ্রাহকদের ওপর একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে মিটার। কয়েক দফা বৈঠকের পরও সমাধান না হওয়ায় এখন বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
আন্দোলনের মাত্রা যে ধীরে ধীরে বাড়ছে, তার একটি নজির দেখা গেছে গত ১ আগস্ট। ওইদিন শহরের মাসদাইর এলাকায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন করতে গেলে স্থানীয় লোকজন মিটার ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সভা, সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ ও মতবিনিময় করেছেন নাগরিক অধিকার ফোরামের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ তারা গণমিছিলেরও আয়োজন করেছেন।
স্থানীয়দের আপত্তির মূল জায়গা শুধু মিটার স্থাপন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিচার্জ, বিভিন্ন চার্জ কর্তন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পদ্ধতি। নাগরিক অধিকার ফোরামের নেতাদের দাবি, ডিপিডিসি কোনো ধরনের আগাম নোটিস, ন্যূনতম জনমত গ্রহণ বা গণশুনানি ছাড়াই প্রিপেইড মিটার বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
তাদের অভিযোগ, রিচার্জ প্রক্রিয়াটিও গ্রাহকদের কাছে যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়। মাসের প্রথম রিচার্জ থেকেই ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও ভ্যাটের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে।
শুধু টাকা কাটার হিসাব নয়, রিচার্জের প্রক্রিয়াটিও অনেক গ্রাহকের কাছে জটিল হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। প্রতিবার রিচার্জে ২০-২০০ ডিজিটের কার্ড ব্যবহার করতে হয়, যা অনেক গ্রাহকের জন্য ঝামেলার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যালান্স শেষ হওয়ার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুমের ভাষায়, ‘প্রিপেইড মিটার সাধারণ মানুষের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা নয়। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রক্রিয়া আরও জটিল। অনেক গ্রাহক বুঝতে পারছেন না, কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, রিচার্জের টাকা কীভাবে সমন্বয় হচ্ছে কিংবা বিভিন্ন চার্জ কীভাবে আরোপ করা হচ্ছে। এতে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা।’
একই কথা বলেছেন সংগঠনের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। ‘বিদ্যুৎ কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। গ্রাহকের মতামত উপেক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ একটি ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়’— বললেন তিনি। দিয়েছেন প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও।
তবে নাগরিকদের আপত্তির পাশাপাশি বিষয়টি পৌঁছেছে জনপ্রতিনিধিদের কান পর্যন্ত। নাগরিক অধিকার ফোরামের নেতারা জেলার কয়েকজন সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকের কাছে দিয়েছেন স্মারকলিপি।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিনের ভাষ্য, প্রিপেইড মিটার নিয়ে জনদাবিগুলো তিনি জানতে পেরেছেন। জাতীয় সংসদ, জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট জায়গায় কথা বলার সুযোগ হলে বিষয়টি উত্থাপন করবেন তিনি।
অবশ্য ডিপিডিসি বলছে, গ্রাহকদের অভিযোগ তারা উপেক্ষা করছে না। প্রিপেইড মিটার প্রকল্পের পরিচালক মো. হানিফের দাবি, স্থানীয় নেতা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন বক্তব্য ও অভিযোগ তারা শুনেছেন।
বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। তার ভাষ্য, ঢাকার ডেমরা, ঝিগাতলা, কলাবাগান, ধানমন্ডি ও পরিবাগ এলাকায় প্রিপেইড মিটার ভালোভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।
ডিপিডিসির এ বক্তব্যের সঙ্গে মিল রেখে নারায়ণগঞ্জের বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, প্রিপেইড মিটার চালুর উদ্দেশ্য গ্রাহকসেবা সহজ করা। নারায়ণগঞ্জ ডিপিডিসি দক্ষিণের প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ কামাল হোসেন বললেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর অংশ হিসেবেই চালু করা হচ্ছে প্রিপেইড মিটার। এর উদ্দেশ্য মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা।’ তবে বিভিন্ন অভিযোগ আসায় সেগুলো তারা নোট করেছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।






