আমের অর্থনীতি পুকুর কেটে নাশ

উত্তরাঞ্চলের লাখো কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও উদ্যোক্তার জীবিকার সঙ্গে শত বছর ধরে সরাসরি যুক্ত আম। ফলটি ওই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিরও একটি বড় অংশ। কিন্তু নানা কারণে হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার আম অর্থনীতি। আম চাষ ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন চাষিরা। কেউ কেউ আমবাগান কেটে খনন করছেন পুকুরও। অথচ দেশের চাহিদা মিটিয়ে আম রপ্তানি হচ্ছে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও কানাডার মতো দেশগুলোয়।
দেশের প্রায় সব জেলাতেই আম চাষ হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর। জেলাগুলোর মধ্যে অবশ্য নওগাঁয় চাষ বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে আমবাগানের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাগানের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টরে। তবে নওগাঁয় আমবাগানের পরিমাণ ১০ হেক্টর বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর।
রাজশাহী অঞ্চলের চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাগান কমে যাওয়ার বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত পুকুর খনন ও মাছ চাষের সম্প্রসারণ। ধান বা আম চাষের তুলনায় মাছ চাষে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি লাভের সম্ভাবনা থাকায় অনেক কৃষক বাগান কেটে করছেন পুকুর।
তরুণ উদ্যোক্তা আসিফ ইকবাল বলেছেন, কৃষক আম চাষ করে পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত লাভ। অন্যদিকে সবজি, মাছ চাষ বা স্বল্পমেয়াদি ফসলে দ্রুত আয় পাওয়া যায়। আম চাষে সময় বেশি লাগে, ঝুঁকিও বেশি। তাই কৃষকরা ঝুঁকছেন বিকল্পের দিকে।
চলতি মৌসুমে শুধু রাজশাহীতে প্রায় ৩৭ লাখ গাছ থেকে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৪ টন। গড়ে প্রতি কেজি ৩২ টাকা ধরে শুধু রাজশাহীতেই রয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যবসায়ের সম্ভাবনা। চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর— এই চার জেলা মিলিয়ে আমের বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি বৃষ্টি হয়েছে সামান্য। একই সময়ে তাপমাত্রা ওঠানামা করেছে ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বেড়েছে পোকার আক্রমণ। অতিরিক্ত খরায় গাছের বোঁটা শুকিয়ে গেছে এবং ঝরে পড়েছে আম— জানিয়েছেন পুঠিয়ার বাগানমালিক আসিফ ইকবাল। চারঘাটের আমচাষি সাজেদুর রহমান বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও কাটেনি সংকট। সেচের অভাবে প্রচণ্ড গরমে শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে অনেক আম।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেছেন, প্রচণ্ড গরম ও খরায় বিকালের দিকে গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া এবং প্রয়োজনে পাতায় স্প্রে করা জরুরি। তিনি স্বীকার করেছেন, কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেচের জ্বালানি ব্যয়।






