রাগ করে হেলিকপ্টার কেনা!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘কষ্ট ও ভোগান্তি সয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। জরুরি প্রয়োজনে এ যাতায়াত রীতিমতো আরও কঠিন-অস্বস্তিকর ছিল। তাই প্রয়োজনে ভেবেচিন্তে হেলিকপ্টার কিনে ফেললাম। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা পরিবারের কাউকে না জানিয়েই কাজটি সারলাম।’
শোনা যাক ১৬ বছর আগের সেই কাহিনী। যাতে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের তখনকার যোগাযোগের দুরবস্থার করুণ চিত্র। মনভোলানো এক হাসি। চেয়ারে নড়েচড়ে আরাম করে বসলেন এ শিল্পপতি। বললেন, একটি বহুজাতিক হোম অ্যাপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কেনাবেচার কথাবার্তা চলছিল আমাদের। হঠাৎ সাইনিং সেরেমনির তারিখ পড়ে। চট্টগ্রাম থেকে অনেক চেষ্টা করেও বিমানের টিকিট পেলাম না।
হেলিকপ্টার ভাড়া করতে বললাম। ভাড়া হলোও। বাবা বললেন, তিনিও ঢাকা যাবেন। সঙ্গে আরও দুইজন। এই অবস্থায় চার সিটের হেলিকপ্টারে আমার জায়গা হলো না।
কীভাবে যাই ঢাকা? সড়কপথে যেতে তখন সময় লাগত ১০ ঘণ্টার বেশি। অনেক কষ্টে ট্রেনের একটি টিকিট পেলাম। তাও আবার টয়লেটের পাশে। দুর্গন্ধের অসহ্য যন্ত্রণা। ঢাকায় পৌঁছে সাইনিং মিটিং শেষ করে বন্ধুর অফিসে ঢুকলাম। বন্ধু জানতে চাইল, চট্টগ্রাম থেকে কীভাবে এলাম।
এত কষ্ট, এত দুর্ভোগের কাহিনি শুনে সে অবাক হয়ে বলল, এভাবে আর কত দিন। ল্যাপটপে অনলাইনে ঢুকে হেলিকপ্টার সার্চ করে বুকিং নিশ্চিত করলাম। আয়ারল্যান্ড থেকে হেলিকপ্টার কিনে সিঙ্গাপুর নিয়ে আসার নির্দেশনা দিয়ে দিলাম।
না থেমে কথাগুলো বলছিলেন দেশের তরুণ ও মেধাবী শিল্পপতিদের একজন। ১৬ বছর আগে হেলিকপ্টার কেনার সময় তার বয়স ছিল ৩৬ বছর। এত অল্প বয়সে পরিবারকে না জানিয়ে হেলিকপ্টার কেনার একক সিদ্ধান্ত! হ্যাঁ, এটাই সাহস করে করেছেন তিনি। প্রবাদ আছে— সাহসের নাম ভাগ্যলক্ষ্মী।
এতদিন হেলিকপ্টার কেনার এ অজানা কাহিনি গণমাধ্যমের কারও সঙ্গে শেয়ার করেননি। তিনি কেন এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ‘আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম, এ হেলিকপ্টার আমাকে কতটা মাইলেজ বা সুবিধা দেবে। কোম্পানি কতটা উপকৃত হবে। যদিও এত টাকা বিনিয়োগ বেশ কঠিন ছিল।’
কাহিনির এখানেই শেষ নয়। সিঙ্গাপুর থেকে পাঁচ দিন চালিয়ে পাইলট বাংলাদেশে নিয়ে এলো হেলিকপ্টার। দুইশ-আড়াইশ কিলোমিটার চালানোর পর জ্বালানি রি-লোড করতে হয়। আবার রাতের বেলায় চলে না হেলিকপ্টার। যেসব দেশের আকাশ দিয়ে আসতে হয়, দরকার তাদের পারমিশনও। হেলিকপ্টার কেনার পর বাংলাদেশে এনে চালাতে সময় লেগেছে প্রায় এক বছর। কয়েক ধাপের অনুমোদন ও প্রক্রিয়া শেষ করতে এই সময় লাগে।
২০০৯ সালের ঘটনা এটি। ব্যক্তিমালিকানায় তখন প্রয়াত শিল্পপতি স্যামসন এইচ চৌধুরীর স্কয়ার গ্রুপ, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মান্নানের সানম্যান গ্রুপসহ মোট চারটি হেলিকপ্টার ছিল। ১৬ বছর পর এখন হেলিকপ্টার ৩১টি। সবচেয়ে আধুনিক ১৮ জন ধারণক্ষমতার দুই ইঞ্জিনের হেলিকপ্টার ‘বেল-৪২৯’ এখন বাংলাদেশে আছে মাত্র একটি।
হেলিকপ্টার শুধু শখের বশে কেনেননি। বড় ও ভারী শিল্প গড়ে তোলার তাগিদ ছিল। তখন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার লেনের নির্মাণকাজ চলছিল। বেসরকারি বিমানের সংখ্যাও কম। ঢাকা-চট্টগ্রাম টিকিট সহজে মিলত না। ট্রেনের অবস্থা আরও খারাপ। সবমিলিয়ে দেশি-বিদেশি ব্যাংকের কর্মকর্তা, বিদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে জরুরি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে যোগ দেওয়া, কারখানা পরিদর্শনে হেলিকপ্টারই ছিল ভরসা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে দেশের সব বড় শিল্প গ্রুপের পরিচালকরা ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার ব্যবহার শুরু করেন সে সময়।
এ হেলিকপ্টার কেনার কথা পরিবারকে জানাতে গিয়ে ঘটে এক মজার ঘটনা। বাসায় পরিবারের সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় তিনি তার বাবাকে হেলিকপ্টারের ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘আব্বু এটা দেখতে কেমন? তিনি বললেন— সুন্দর, দাম কত? জবাব দিলাম— কিনে ফেলেছি তো। আব্বু খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন— খুব ভালো করেছ।’
এত দাম দিয়ে কেনা হেলিকপ্টারের কথা শুনে তার বাবা রাগ করবেন বা বিরক্ত হবেন ভেবেছিলেন ছেলে। সেটি না হয়ে বাবা তার ছেলের সাহসের প্রশংসা করে উৎসাহ জোগালেন।
১৬ বছর ধরে এই হেলিকপ্টার দ্রুত ও জরুরি যাতায়াতে বেশ কাজে দিয়েছে কোম্পানির ও ব্যবসার- বললেন এই শিল্পপতি।




