চট্টগ্রামে আটকা পর্যটক এক্সপ্রেস
ঝড়ের রাতে পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় হাজার যাত্রী
- রেললাইনে ২০ ইঞ্চি পানি
- স্বপ্নের ভ্রমণ আটকা চট্টগ্রাম স্টেশনে

চট্টগ্রামে আটকে আছে ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’
পরিবারের ২১ সদস্য নিয়ে আন্তঃনগর ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেসে কক্সবাজার বেড়াতে যাচ্ছিলেন মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। আনন্দ ভ্রমণের সেই পরিকল্পনা এখন পরিণত হয়েছে দুশ্চিন্তার অপেক্ষায়। টানা ভারী বর্ষণে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামেই আটকা পড়েছে ওই ট্রেন। পরিবারের নারী-শিশুদের নিয়ে প্রায় আট ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিকল্প গাড়ি ধরতে স্টেশনের দিকে ছুটছিলেন তিনি। বললেন, ‘এমন ভোগান্তিতে আগে কখনো পড়িনি। পুরো ভ্রমণের আনন্দটাই মাটি হয়ে গেছে।’
শুধু মাহফুজুর রহমান নন, পর্যটক এক্সপ্রেসে থাকা প্রায় এক হাজার যাত্রীর অভিজ্ঞতা একই। রাত বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে তাদের উৎকণ্ঠা। রেলওয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে যাত্রীদের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, পুরো যাত্রাই বাতিল হতে পারে। এতে নারী ও শিশুদের নিয়ে রাতের বেলা আরও বিপাকে পড়বেন যাত্রীরা।
টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের চট্টগ্রামের ষোলশহর-জানালীহাট সেকশন তলিয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার দুপুর পৌনে একটায় ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস আটকা পড়ে। একই সেকশনের ফরেস্ট গেট এলাকায় রেললাইনের ওপর উপড়ে পড়েছে গাছ। এতে সেখানে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে থাকে ট্রেনটি। বিকাল চারটায় গাছটি সরিয়ে নেওয়া হলে সাড়ে চারটায় ষোলশহর স্টেশনে নিয়ে আসা হয় ট্রেনটিকে। রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত ষোলশহর স্টেশনে অপেক্ষার পর পৌনে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে আসে সেটি। অথচ সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটির দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজার পৌঁছানোর কথা।
জানতে চাইলে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ বলেছেন, ‘রেললাইনের উপর এখনো প্রায় ২০ ইঞ্চি পানি জমে আছে। পানি ছয় ইঞ্চিতে না নামলে ইঞ্জিন চালানো সম্ভব নয়। সন্ধ্যার দিকে পানি কিছুটা কমলেও বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় পানি আবার বাড়তে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে পুরো যাত্রাই বাতিল হয়ে যেতে পারে।’
ট্রেন আটকে পড়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগের কোনো সীমা ছিল না। কেউ কক্সবাজারে আগেভাগে হোটেল বুকিং দিয়েছিলেন, কেউ দেননি। ঝড়ের রাতে পরিবার নিয়ে কোথায় রাত কাটাবেন, সেই অনিশ্চয়তায় ভুগছিলেন অনেকে। তাদেরই একজন রুহুল আমিন, পেশায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তিনি জানান, বিকাল পাঁচটার দিকে লাগেজ নামিয়ে স্টেশনে নেমে গিয়েছিলেন তিনি, এমনকি রেন্ট-এ-কার থেকে গাড়িও ভাড়া করে ফেলেছিলেন। কিন্তু ট্রেনের লোকজন ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের আবার ট্রেনে তুলে দেন। অথচ রাত ৯টা পর্যন্তও কোনো সিদ্ধান্ত না জানানোয় পরিবারের আট সদস্য নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন তিনি।
এবার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া আলিশা আল ফাইজার জন্য এই ভ্রমণ ছিল বিশেষ কিছু। মা-বাবার সঙ্গে জীবনের প্রথম কক্সবাজার সফর। কিন্তু ট্রেনে আটকা পড়ে সেই আনন্দ মুহূর্তেই মলিন হয়ে যায়। দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে অসুস্থ বাবাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি।
দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের তিন বন্ধু। প্রায় আট ঘণ্টা অপেক্ষার পর তারা রীতিমতো ভেঙে পড়েন, আর কক্সবাজার যেতে চান না। ট্রেন থেকে নেমে তারা ছুটছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী বাস ধরতে। তাদেরই একজন মোহাম্মদ নাবিল বলেছেন, ‘শুনেছি কক্সবাজারেও আবহাওয়া ভালো না। এমন আতঙ্ক নিয়ে ভ্রমণ করা যায় না। এখন কোনোভাবে বাড়ি পৌঁছাতে পারলেই বাঁচি।’
ষোলশহর স্টেশনের মাস্টার আরিফুল ইসলাম বলেছেন, রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের লোকজন পানিতে তলিয়ে যাওয়া রেললাইন এলাকায় কাজ করছেন এবং পানি নামলেই ট্রেন ছাড়া হবে। যাত্রীদের নিয়মিত তথ্য দেওয়া হচ্ছে।




