শহরের সব মানুষের বাস এক দালানে!

শহরের প্রায় সব বাস বেগিচ টাওয়ার নামের চৌদ্দতলা এক দালানে। ছবি: সংগৃহীত
একবার কল্পনা করুন, আপনার শহরের প্রায় সবাই থাকে একই দালানে। পাশের ফ্ল্যাটে হয়তো মেয়র, নিচতলায় পুলিশ, আরেক তলায় মুদি দোকান, অন্য কোথাও ডাকঘর। স্কুলে যেতে হলে রাস্তায় বেরোতে হয় না, শুধু সুড়ঙ্গ ধরে হাঁটলেই হলো। শুনতে গল্পের মতো লাগলেও এমন শহর সত্যিই আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার ছোট্ট শহর হুইটার যেন আধুনিক যুগের এক অদ্ভুত মানব-কলোনি, যেখানে অধিকাংশ মানুষ থাকেন একটি মাত্র ভবনে। বরফ, পাহাড় আর সমুদ্রঘেরা এই শহরের জনসংখ্যা মেরে-কেটে তিন শ। তাদের প্রায় সবার বাস বেগিচ টাওয়ার নামের চৌদ্দতলা এক দালানে। হিসাব বলছে, শহরের মোট বাসিন্দাদের বিপুল অংশই এখানেই থাকেন। তাই অনেকে মজা করে বলেছেন, এটি আসলে শহর নয়, একটি দালান, যার বাইরে একটু প্রকৃতি আছে।
বেগিচ টাওয়ারের ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। ১৯৫০-র দশকে শীতল যুদ্ধের সময় এটি নির্মাণ করা হয়েছিল সামরিক ব্যারাক হিসেবে। তখন আলাস্কার কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অনেক। সৈন্য, সরঞ্জাম আর রসদ রাখার জন্যই গড়ে ওঠে এই বিশাল স্থাপনা। পরে সামরিক ব্যবহার কমে গেলে সেটিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় আবাসিক ভবনে। এখন এখানে দুই ও তিন কামরার বহু অ্যাপার্টমেন্ট, ডরমিটরি, অফিসকক্ষ, নানা সেবা কেন্দ্র সবই আছে। এই দালানের ভেতরেই পাওয়া যায় মুদি দোকান, ডাকঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা, ছোটখাটো কার্যালয় এমনকি পুলিশ স্টেশনও। বাইরে ঝড়, তুষারপাত বা বরফঝঞ্ঝা চললেও বাসিন্দাদের অনেক প্রয়োজন মিটে যায় ঘর থেকে খুব দূরে না গিয়েই। শীতের দিনে এ সুবিধার মূল্য বোঝা যায় সবচেয়ে বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার ছোট্ট শহর হুইটার যেন আধুনিক যুগের এক অদ্ভুত মানব-কলোনি
হুইটার এমন এক জায়গায়, যেখানে পৌঁছানোই আলাদা রোমাঞ্চ। স্থলপথে শহরে ঢুকতে হয় পাহাড় কেটে বানানো দীর্ঘ অ্যান্টন অ্যান্ডারসন স্মৃতি সুড়ঙ্গ দিয়ে। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ একসময় রেলপথের জন্য বানানো হয়েছিল, পরে গাড়ি চলাচলের জন্যও খুলে দেওয়া হয়। এটি একমুখী চলাচল ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট সময়ে এক দিকের গাড়ি যায়, পরে অন্য দিকের। বহু বছর ধরে রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রবেশ বন্ধ থাকত; এখন সময়সূচি মৌসুমভেদে বদলায়, তবে রাত গভীর হলে চলাচল সীমিত থাকে। অর্থাৎ, আপনি যখন খুশি গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়তে পারবেন, এমন নয়।
হু্ট্রইটারে ট্রেনেও আসা যায়, নৌকাতেও আসা যায়। কারণ শহরটি প্রিন্স উইলিয়াম প্রণালির তীরে অবস্থিত। সমুদ্রঘেঁষা হওয়ায় এখানে ছোট-বড় জলযান ভেড়ে। গরমের মৌসুমে প্রমোদতরীও আসে। তখন শান্ত শহর হঠাৎ সরগরম হয়ে ওঠে। কিন্তু শীতে? তখন হুইটার যেন অন্য জগৎ। চারপাশ সাদা বরফে ঢেকে যায়। তীব্র ঠান্ডা বাতাস, ভারী তুষারপাত, দীর্ঘ অন্ধকার আর বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি সব মিলিয়ে জায়গাটি কঠিন প্রকৃতির পরীক্ষাগার। বছরে প্রচুর বৃষ্টি ও তুষারপাত হয় এখানে।
আলাস্কার সবচেয়ে ভেজা বসতিগুলোর একটি হিসেবেও হুইটার পরিচিত। তাই এখানকার মানুষের জীবনও আলাদা। অনেকেই কাজ করেন বরফ পরিষ্কার করা, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, বন্দর পরিচালনা, পৌর প্রশাসন, পর্যটনসেবা বা স্থানীয় ব্যবসায়। আশপাশের সমুদ্রে মাছ ধরাও গুরুত্বপূর্ণ পেশা। গরমের সময়ে শৌখিন মাছশিকারিরাও ভিড় করেন। শহরটিতে একটি বিদ্যালয় আছে, যা বেগিচ টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত পথ ধরে যাওয়া যায়। ছোট্ট এই স্কুলে বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোরেরা পড়ে। শিক্ষকরা দূর রাজ্য থেকেও এসে এখানে কাজ করেন। কেউ কেউ আবার এখানেই জন্মে বড় হয়ে পরে শিক্ষক বা কর্মী হিসেবে ফিরে আসেন। কারণ হুইটার ছোট হলেও অনেকের কাছে এটাই ঘর।
হুইটারের প্রশাসনও ছোট পরিসরের। মেয়র ও কাউন্সিল সদস্যরা মিলে শহর পরিচালনা করেন। পুলিশ বিভাগে সদস্যসংখ্যাও খুব বেশি নয়। বড় শহরের মতো অপরাধপ্রবণতা এখানে কম। সবাই সবাইকে চেনে। এটিও এক ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুইটার নতুন করে বিখ্যাত হয়। এখানকার তরুণ বাসিন্দারা ‘এক দালানের শহরে জীবন’ নিয়ে ভিডিও পোস্ট করতে শুরু করলে বিশ্বজুড়ে মানুষ অবাক হয়ে যায়। অনেকে ভাবতেই পারেননি, আধুনিক আমেরিকাতেও এমন শহর আছে, যেখানে এক ভবনই প্রায় পুরো সমাজকে ধারণ করে।
শহরটির আয়তন বড়। পাহাড়, জলভাগ আর খোলা প্রকৃতি মিলিয়ে বিস্তৃত এলাকা। কিন্তু বসবাসের কেন্দ্র যেন এক বিন্দুতে সংকুচিত। বাইরে বিস্তীর্ণ প্রকৃতি, ভেতরে ছোট্ট মানবসমাজ। হুইটারে গেলে পর্যটকেরাও থাকতে পারেন।
বেগিচ টাওয়ারে ভাড়ার ব্যবস্থা আছে, আশপাশে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হিমবাহ, পাহাড়, বন্য পরিবেশ। কাছেই চুগাচ জাতীয় অরণ্যাঞ্চল। গ্রীষ্মকালে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি দুর্দান্ত গন্তব্য। পৃথিবীতে বড় বড় মহানগর আছে, কোটি মানুষের নগর আছে, আকাশচুম্বী ভবনের শহর আছে। কিন্তু এমন শহর খুব কমই আছে, যেখানে শহর বলতে বোঝায়। একটি দালান, কয়েকশ মানুষ, একটি সুড়ঙ্গ, আর চারদিকে বরফে ঘেরা নিঃসঙ্গ সৌন্দর্য। হুইটার সেই বিরল ব্যতিক্রম।
সূত্র: সিবিসি নিউজ, আলাস্কা ডট গভ, সিটি অব হুইটার, ইউএস সেনসাস ব্যুরো, উইকিপিডিয়া, ট্রাভেল আলাস্কা।




