চলাফেরা করতে পারে এই পাথরেরা

সংগৃহীত ছবি
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক পৃথিবীর অন্যতম এক অদ্ভুত জায়গা। এটি পৃথিবীর উষ্ণতম স্থান, আবার এটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে নিচু এবং শুষ্ক এলাকা হিসেবেও পরিচিত; কিন্তু এই মরুভূমির বুকে এমন কিছু ঘটে, যা বিজ্ঞানীদের প্রায় এক শতাব্দী ধরে ঘোরের মধ্যে রেখেছিল। এখানকার 'রেসট্র্যাক প্লায়া' নামক একটি শুকিয়ে যাওয়া হ্রদে শত শত পাথর নিজে নিজেই চলাফেরা করে। কোনো মানুষ বা প্রাণীর সাহায্য ছাড়াই এই পাথরগুলো বালুর ওপর এঁকেবেঁকে লম্বা পথ পাড়ি দেয়।
এই মরুভূমি এলাকার শুকনো হ্রদের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন আকারের অসংখ্য পাথর। ছোট পাথর থেকে শুরু করে শত শত কেজি ওজনের বড় পাথরও আছে। মজার বিষয় হলো, এই পাথরগুলোর পেছনে মাটির ওপর গভীর দাগ দেখা যায়। এই দাগগুলো দেখে বোঝা যায় যে, পাথরগুলো কখনো সোজা আবার কখনো আঁকাবাঁকা পথে অনেকটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে। কোনো কোনো পাথর তো প্রায় ৮৬০ ফুট থেকে শুরু করে দেড় হাজার ফুট পর্যন্ত পথ পাড়ি দিয়েছে।
১৯০০ সালের শুরুর দিক থেকে এই রহস্যময় পাথরগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। কেউ একে অলৌকিক মনে করতেন, কেউ বা দায়ী করতেন ভিনগ্রহের প্রাণীদের। ২০ শতকের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, কিছু ভারী পাথর এমনভাবে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে, যা ব্যাখ্যা করা ছিল অসম্ভব। যেমন— ২০০০ সালের দিকে ৭০০ পাউন্ড ওজনের 'কারেন' নামের একটি বিশালাকার পাথর নিখোঁজ হয়ে যায়। কয়েক বছর পর সেটিকে আগের জায়গা থেকে প্রায় আধা মাইল দূরে খুঁজে পাওয়া যায়।
২০০০ সালের দিকে একদল বিজ্ঞানী এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে সাত বছর ধরে এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দিয়েছিলেন কিছু পাথরের নামও। সেখানে কারেন নামের একটি ৭০০ পাউন্ড ওজনের বিশাল পাথর ছিল। গবেষণার সময় পাথরটি একদম স্থির থাকলেও বিজ্ঞানীরা ফিরে এসে দেখেন সেটি তার জায়গা থেকে প্রায় আধা মাইল দূরে চলে গেছে।
এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে সাত বছর ধরে গবেষক দলটি ১৫টি পাথরের গায়ে জিপিএস বসিয়ে অপেক্ষা করেছিলেন; কিন্তু পাথরগুলো নড়াচড়ার নাম-গন্ধও করছিল না। গবেষক ডক্টর রালফ লরেঞ্জ মজা করে একে দুনিয়ার সবচেয়ে বিরক্তিকর পরীক্ষা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কারণ এই পাথরগুলো তাদের ১০ লাখ মিনিটের জীবনের মধ্যে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য নড়াচড়া করে।
তবে ২০১৪ সালে এক কাকতালীয় ঘটনায় এ রহস্যের জট খুলে যায়। জেমস নরিস এবং রিচার্ড নরিস নামে দুই গবেষক প্রথমবার পাথরগুলোর নড়াচড়া ক্যামেরায় বন্দি করতে সক্ষম হন। তারা সরাসরি পাথরগুলোকে চলতে দেখেন। তারা দেখতে পান যে, এই জাদুকরী ঘটনার পেছনে রয়েছে বরফ পানি এবং বাতাসের এক চমৎকার সমন্বয়।
এই পাথরগুলো মূলত ডলোমাইট এবং সায়েনাইট নামক উপাদান দিয়ে তৈরি। এগুলো চারপাশের পাহাড় থেকে ভেঙে নিচে সমতলে এসে পড়ে। শীতকালে যখন মরুভূমিতে সামান্য বৃষ্টি হয়, তখন সেখানে অল্প পানি জমে তৈরি হয় একটি অগভীর পুকুর। রাতের প্রচণ্ড ঠান্ডায় সেই পানি জমে তৈরি করে বরফের পাতলা চাদর। পরদিন সকালে সূর্যের তাপে সেই বরফ ভাঙতে শুরু করে। ঠিক সেই সময় যদি হালকা বাতাস থাকে, তবে বরফের সেই বিশাল এবং পাতলা চাদরগুলো পাথরগুলোকে পেছনের দিক থেকে ধাক্কা দেয়। এই ধাক্কা বা চাপের ফলে পাথরগুলো কাদার ওপর দিয়ে খুব ধীরে ধীরে পিচ্ছিল পথে স্লাইড করতে শুরু করে।
একে বলা হয় আইস শোভ বা বরফের ধাক্কা। এই পাথরগুলো কিন্তু খুব দ্রুত চলে না। লাখ লাখ মিনিটের মধ্যে মাত্র কয়েক মিনিট পাথরগুলো সচল থাকে। আর ঠিক এ কারণেই মানুষ কখনো এগুলোকে চলতে দেখেনি। আরেকটি মজার বিষয় হলো, সব পাথর একইভাবে চলে না। যেসব পাথরের নিচের অংশ খসখসে, তারা সাধারণত সোজা পথে চলে, আর যাদের নিচ মসৃণ তারা এদিক-সেদিক ঘুরে যায়।
শত বছরের জল্পনা-কল্পনার পর আজ আমরা জানি এই রহস্যের পেছনে কোনো জাদুর হাত নেই। বরং বরফ, পানি এবং বাতাসের এক নিখুঁত ভারসাম্যের কারণেই ডেথ ভ্যালির পাথরগুলো আজ সগৌরবে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এখন এই জায়গাটি পর্যটকদের কাছে এক অদ্ভুত আকর্ষণের নাম, যেখানে তারা নিজ চোখে প্রকৃতির এই অসাধারণ কারুকাজ দেখতে ভিড় জমান।







