ভেড়া বিক্রি করে শুরু, লাখো গাছে মরুভূমি রূপ নিল বনে

বর্তমানে উশিন ব্যানারের মু উস মরুভূমির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে
‘আপনার সহায়তায় এত বছর আগে যে গাছগুলো লাগানো হয়েছিল, সেগুলো এখন বিশাল এক বনে পরিণত হয়েছে। আপনি কবে এসে সেগুলো দেখবেন? আমি সত্যিই আবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ যুক্তরাষ্ট্রের রোনাল্ড সাকলস্কিকে পাঠানো এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় এভাবেই বলছিলেন চীনের জাতীয় মডেল কর্মী ইন ইউঝেন।
প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে থাকা ৬৯ বছর বয়সী সাকলস্কি ভিডিওটি দেখে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন। তিনি জবাবে জানান, তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন চীন সফরে যাওয়ার। ইনের সঙ্গে একটি গাছ লাগানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি। নিকট ভবিষ্যতে চীনে সাক্ষাৎ করতে সম্মত হয়েছেন দুজনই।
যদি প্রায় ১০টি গাছ বেঁচে থাকতে পারে, তাহলে পরে হয়তো ১০০টি হবে, তারপর ১ হাজার
১৯৮৫ সালে ইন ইউঝেন উত্তর চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অরদোস শহরের উশিন ব্যানারের সালাওউসু গ্রামে বিয়ে করে আসেন। মু উস মরুভূমির গভীরে অবস্থিত চারদিকে বালিয়াড়ি দিয়ে ঘেরা ছিল গ্রামটি।
ইন বুঝতে পেরেছিলেন, বালুর বিস্তার ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো গাছ লাগানো। ১৯৮৬ সালে তিনি পরিবারের একটি ভেড়া বিক্রি করে ৬০০টি চারা কেনেন। সেগুলো লাগান বাড়ির চারপাশে। কিন্তু কিছুদিন পর আসে ভয়াবহ বালুঝড়। টিকে থাকে ১০টিরও কম গাছ। তবুও হাল ছাড়েননি ইন।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘যদি প্রায় ১০টি গাছ বেঁচে থাকতে পারে, তাহলে পরে হয়তো ১০০টি হবে, তারপর ১ হাজার।’
হতাশ না হয়ে তিনি ও তার স্বামী বাই ওয়ানশিয়াং চারা ও সরঞ্জাম নিয়ে গভীর বালিয়াড়িতে যেতে শুরু করেন। ৪০ বছর ধরে প্রায় দুই মিটার লম্বা একটি ইস্পাতের রড ছিল ইনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সরঞ্জাম। তিনি সেটি বালুর মধ্যে গেঁথে গর্ত করতেন, সেখানে চারা বসিয়ে পানি দিতেন এবং পা দিয়ে মাটি শক্ত করে চেপে দিতেন। কয়েক দশকের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারে প্রায় ৬৭ সেন্টিমিটার ক্ষয় রডটির।
গত চার দশকে সরকারি উদ্যোগ এবং ইনের মতো মরুকরণ প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রচেষ্টায় এই অঞ্চলের দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ইনের বাড়ির আশপাশের ৭০ হাজার মু (প্রায় ৪ হাজার ৬৬৭ হেক্টর) বালুময় জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে লাগানো হয়েছে ৮০ লাখের বেশি গাছ।
বর্তমানে উশিন ব্যানারের মু উস মরুভূমির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। বনভূমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশে।
বিশ্ব জুড়ে আরও মানুষ যখন এই বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু করলেন, তখন আমি বুঝতে পারলাম এটি পুরো মানবজাতিরই একটি স্বপ্ন
১৯৯৯ সালে সাকলস্কি টেলিভিশনে ইনের কাজ নিয়ে একটি অনুষ্ঠান দেখেন এবং গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। সাকলস্কি তখন চীনের হেনান প্রদেশের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পরে তিনি একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৫ হাজার ডলার সংগ্রহ করে সহায়তা করেন ইনের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে।
অনুদান পেয়ে বিস্মিত হয়ে যান ইন।
তিনি বলছিলেন, ‘একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ, আমি কে তা যাচাই না করেই আমার জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। আমাকে নিশ্চিত করতেই হতো যে গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে উঠবে। আমি সেই বিশ্বাস নষ্ট করতে পারতাম না।’
ইন যোগ করেন, ‘বিশ্ব জুড়ে আরও মানুষ যখন এই বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু করলেন, তখন আমি বুঝতে পারলাম এটি পুরো মানবজাতিরই একটি স্বপ্ন।’
গাছঘেরা রাস্তার আরও সামনে রয়েছে একটি পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে খোদাই করা আছে— ‘পৃথিবীর নাগরিকরা’। এর পেছনের অংশে চীন ও বিদেশের সেসব সমর্থকদের নাম লেখা রয়েছে, যারা নিজ নিজ উপায়ে এই বন গড়ে তুলতে রেখেছেন অবদান।
ইনের অধ্যবসায় আশপাশের ২৪০টিরও বেশি পরিবারকে বৃক্ষরোপণে অনুপ্রাণিত করেছে। ৩ হাজার মুর বেশি বনভূমি গড়ে তুলেছেন তাদের প্রত্যেকেই।




