এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার গাজায়

গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকায় ট্যাংকার ট্রাক থেকে পানি সংগ্রহ করছে শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত
গাজায় এখন চলছে এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য যুদ্ধ। একদিকে আকাশ থেকে পড়ছে ইসরায়েলি বোমা, অন্যদিকে এক মগ পানির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে মরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পানির গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে দুইজন চালক ও একজন প্রকৌশলীকে। পানি দিতে গিয়েও যাচ্ছে জীবন। এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতায় গাজার লাখ লাখ মানুষ এখন ধুঁকছেন পানির অভাবে।
খাবার পানির অভাব তো আছেই, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিষ্কার হওয়ার উপকরণের সংকট। ইসরায়েল গাজায় ঢুকতে দিচ্ছে না সাবান, ডিটারজেন্ট আর শ্যাম্পু। ফলে বাজারে এসব জিনিসের দাম এখন নাগালের বাইরে।
৭ কেজির এক প্যাকেট ওয়াশিং পাউডারের দাম ৫০ শেকেল থেকে বেড়ে ১০০ শেকেলের উপরে চলে গেছে। ফলে শরণার্থী শিবিরে উপচে পড়া মানুষেরা এখন নোংরা পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, আর হু হু করে ছড়াচ্ছে নানা রোগ।
গত আড়াই বছরের যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় গাজার প্রায় সব পানির পাইপলাইন আর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা হয়ে গেছে ধ্বংস। গাজার পানি বিভাগের কর্মকর্তা ওমর শাতাত আক্ষেপ করে বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা হারিয়েছেন অন্তত ১৯ জন কর্মীকে। যারা পানির পাম্প ঠিক করতে বা মানুষের কাছে পানি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন, তাদেরকেই বেছে বেছে করা হচ্ছে টার্গেট।
গত সোমবার উত্তর গাজার আল-জাইন কূপে কাজ করার সময় হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে একজন প্রকৌশলী নিহত হন এবং কূপটির মারাত্মক ক্ষতি হয়। এই একটি কূপের ওপর হাজার হাজার মানুষ নির্ভরশীল ছিল। এর আগে ইউনিসেফের দুইজন চালককেও পানি সরবরাহ কেন্দ্রে গুলি করে মারে ইসরায়েলি সেনারা। ফলে এখন মানুষের কাছে পানি পৌঁছানোর সব পথই যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ বলছে, একজন মানুষের সুস্থভাবে বাঁচার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৫০ থেকে ১০০ লিটার পানি দরকার। কিন্তু গাজায় এখন একজন মানুষ খাওয়ার জন্য পাচ্ছেন মাত্র ৭ লিটার আর ধোয়া-মোছার জন্য ১৬ লিটার পানি। অনেকে তো দিনে ৬ লিটার পানিও জোটাতে পারছেন না। এক ফোঁটা পানির জন্য তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকার এখন গাজার আকাশ-বাতাস ভারি করে তুলছে।
‘মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স’ এর কর্মীরা জানাচ্ছেন, নোংরা পানি আর অপরিচ্ছন্নতার কারণে মানুষ পঙ্গপালের মতো অসুস্থ হচ্ছে। পরিষ্কার পানির অভাবে ক্ষতস্থানে পোকা জন্মাচ্ছে, মায়েরা তাদের শিশুদের দুধের ফর্মুলা তৈরি করতে পারছেন না। পরিস্থিতি এতই খারাপ যে, পানির শোকে অনেকে এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও করছেন। ইসরায়েল যেন জেনেবুঝে গাজার মানুষকে তৃষ্ণায় মারার ফন্দি এটেছে।
বাস্তুচ্যুত বাবা ওমর সায়াদা জানান, তার এলাকায় ৫০টি পরিবারের জন্য মাত্র একটি পানির গাড়ি আসে। তাই ভোর ৬টা থেকে লাইনে না দাঁড়ালে এক বালতি পানিও জোটে না। আগে সারা দুপুর পানি পাওয়া যেত, এখন মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য গাড়ি আসে। বাধ্য হয়ে নোংরা পানিই পান করছে তার সন্তানরা, আর ভুগছে পেটের ব্যথায়।
তাঁবুতে থাকা নেসমা রাশওয়ানের অবস্থা আরও করুণ। তার এলাকায় পানির গাড়ি আসে সপ্তাহে মাত্র একবার। উপায় না পেয়ে তিনি তার সন্তানদের সাগরে পাঠিয়ে দেন গোসল করতে। এরপর জমানো পানি থেকে সামান্য একটু মিঠা পানি তাদের গায়ে ঢেলে নুন পরিষ্কার করেন। এক গ্যালন পানির দাম এখন ৫ শেকেল, যা কেনা তার পক্ষে অসম্ভব।
গাজার মানুষ এখন ধ্বংস হয়ে যাওয়া পাম্পের পার্টস কুড়িয়ে জোড়াতালি দিয়ে একটি কূপ সচল করার চেষ্টা করছেন। ইসরায়েল জ্বালানি আর পার্টস আনতে না দেওয়ায় এই জোড়াতালিই এখন তাদের শেষ ভরসা। দেইর আল-বালাহ-র প্রধান ওয়াটার প্ল্যান্টটি নষ্ট হওয়ার পর ৪ লাখ মানুষ এখন পানির অভাবে হাহাকার করছেন।
পয়ঃনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা বলতে গাজায় এখন আর কিছু নেই। শরণার্থী শিবিরের চারপাশে এখন ময়লা আবর্জনা আর নর্দমার পানি উপচে পড়ছে। এই নোংরা পানি এখন ক্লাসরুম থেকে শুরু করে থাকার জায়গাতেও ঢুকে পড়ছে। সংস্কারের জন্য একটু সিমেন্টও পাওয়া যাচ্ছে না। গাজার জন্য অন্তত ১০০টি ময়লা পরিষ্কারের ট্রাক দরকার হলেও এখন টিকে আছে মাত্র ১৫টি ভাঙাচোরা ট্রাক।
এত ধ্বংসলীলার পরেও ইসরায়েল দাবি করছে যে তারা কোনো বাধা দিচ্ছে না। তাদের দাবি অনুযায়ী, তারা চারটি পাইপলাইনের মাধ্যমে গাজায় প্রচুর পানি পাঠাচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। চালকদের গুলি করার বিষয়ে ইসরায়েলি বাহিনী বলছে তারা ‘বিপদ অনুভব’ করেছিল বলেই গুলি চালিয়েছে, কিন্তু পানির প্রকৌশলীকে মারার বিষয়ে তারা কোনো সদুত্তর দেয়নি।






