চাঁদে ঘাঁটি গড়ার দৌড়ে মুখোমুখি আমেরিকা ও চীন

সংগৃহীত ছবি
একসময় মানুষ চাঁদে গিয়েছিল, পতাকা পুঁতেছিল, তারপর যেন সেই গল্প থেমে গিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসে। কিন্তু এখন আবার শুরু হয়েছে নতুন প্রতিযোগিতা। এবার শুধু চাঁদে গিয়ে ফিরে আসা নয়, চাঁদেই স্থায়ী ঘাঁটি গড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই স্বপ্ন ঘিরেই নতুন করে জমে উঠেছে মহাকাশ দৌড়।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবার প্রকাশ করেছে চাঁদে পাঠানোর জন্য বিশেষ রোবটিক ল্যান্ডার, লাফিয়ে চলতে পারা ড্রোন এবং চন্দ্রযানের পরিকল্পনা। এসব যন্ত্র চাঁদের দুর্গম ভূখণ্ডে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করবে, পথ তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে মানুষের বসবাসের প্রস্তুতি নেবে।
এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি ও মহাকাশ কোম্পানিগুলো। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মহাকাশ প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিনও রয়েছে সেই তালিকায়। তাদের তৈরি ‘এনডিউরেন্স’ নামের ল্যান্ডারকে এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে। যাতে এটি চাঁদের মাটিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অবতরণ করতে পারে এবং নিজে থেকেই পথ চিনে চলতে পারে।
নাসার লক্ষ্য খুবই বড়। ২০২৯ সালের আগেই আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারীদের চাঁদে পাঠাতে চায় তারা। শুধু তাই নয়, ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পারমাণবিক ও সৌরশক্তিচালিত একটি আধা-স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে সংস্থাটি।
নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, ‘আমরা আর কখনো চাঁদকে ছেড়ে দেব না।’
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার পেছনে শুধু প্রতীকী গুরুত্ব নয়, বাস্তব কারণও আছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফ আকারে জমে থাকা পানি ভবিষ্যতে পানীয় জল, অক্সিজেন এমনকি জ্বালানি তৈরিতেও কাজে লাগতে পারে। এ ছাড়া চাঁদকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাত্রাও সহজ হতে পারে।
তবে নাসার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র একা নয়, একই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চীনও।
চীন এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা মানুষকে চাঁদে পাঠাতে চায়। সোমবারই দেশটি তাদের শেনঝৌ-২৩ মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে, যা নভোচারীদের নিয়ে গেছে চীনের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, চাঁদে মানুষ নামানোর দৌড়ে এবার চীনই হয়তো এগিয়ে যেতে পারে। ওপেন ইউনিভার্সিটির চন্দ্রবিজ্ঞানী ড. সিমিওন বারবার বিবিসিকে বলেছেন, ‘চীন আগে পৌঁছে গেলে আমি মোটেও অবাক হব না।’
তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন মানুষকে নিরাপদে চাঁদের মাটিতে নামানোর প্রযুক্তি তৈরি করা। এ কাজের দায়িত্ব পেয়েছে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। তাদের তৈরি ‘স্টারশিপ হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম’ এখনো নানা পরীক্ষা, ব্যর্থতা ও বিলম্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে রোবটিক যান ও ড্রোন পাঠিয়ে চাঁদের পরিবেশ, মাটি এবং সম্ভাব্য বসতির জায়গাগুলো পরীক্ষা করা হবে। এরপর সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হবে— যার মধ্যে পারমাণবিক বিভাজনভিত্তিক রিয়্যাক্টরও থাকবে। তারপর ধীরে ধীরে মানুষ সেখানে দীর্ঘ সময় বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করবে।
নাসা জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে তারা অন্তত ২৫টি মিশনের মাধ্যমে প্রায় চার টন সরঞ্জাম চাঁদে পাঠাতে চায়।
তবে বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, পরিকল্পনাটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। কারণ চাঁদে যাওয়া শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য নয়, বরং নতুন ‘স্পেস রেসে’ নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্যও দ্রুত এগোতে চাইছে। আর সেই কারণেই চাঁদ এখন আবার পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার মঞ্চ হয়ে উঠছে।









