আগামীর সময়

আফগান নারীদের জন্য কে দাঁড়াবে?

আফগান নারীদের জন্য কে দাঁড়াবে?

সংগৃহীত ছবি

আফগান তালেবানের জারি করা নতুন দণ্ডবিধি যা নারীদের আরও অধীনস্থ করা এবং একটি নির্মম সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত। এই সরকার সম্পর্কে পূর্বে যারা বলেছিলেন যে তালেবানরা কখনও নিজেদের সংস্কার করতে প্রস্তুত হবে না—তাদের দাবিই কি সত্যি হচ্ছে?


কাবুলকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন এবং নারী, জাতিগত সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অধিকার সম্মান করার অনুরোধ জানিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তবে সেই আহ্বানকে কর্ণপাত করছে না দেশটির সরকার।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়— এই দণ্ডবিধিতে তালেবানের সবচেয়ে প্রাচীন প্রথাগুলোকে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে বিশেষ করে নারীদের আদালতের হাতে ভোগান্তির শিকার হতে হবে।


তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুনদাজা স্বাক্ষরিত ৯০ পৃষ্ঠার এই ফৌজদারি বিধিতে ‘স্বাধীন’ ও ‘দাস’ অপরাধীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রার শাস্তির মতো সেকেলে বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বুধবার জিও নিউজে প্রকাশিত আব্দুস সাত্তারের করা বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ইসলামিক রাষ্ট্র-এর পথ অনুসরণ করে এই বিধিগুলো যুক্ত করা হয়েছে। ২১ শতাব্দীতে দাসপ্রথা পুনঃপ্রবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে নারীদের কোনো না কোনোভাবে দাসের মর্যাদায় নামিয়ে আনা হচ্ছে।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিধিতে নারীদের কার্যত ‘দাস’-এর সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে যে ‘দাস-মালিক’ বা স্বামী তার স্ত্রী বা অধীনস্থের ওপর প্রহারসহ ইচ্ছামতো শাস্তি আরোপ করতে পারে। তুলনামূলক কম গুরুতর অপরাধ ‘তাজির’ (বিবেচনাধীণ শাস্তি) হিসেবে নিষ্পত্তির উৎসাহ দেওয়া হয়েছে—অর্থাৎ, যদি ‘অপরাধী’ স্ত্রী হন, তবে স্বামীর দ্বারা প্রহারই শাস্তি।’

অনেকের মতে, এটি কার্যত গার্হস্থ্য সহিংসতাকে উৎসাহিত করে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত হাড়ভাঙা বা দৃশ্যমান ক্ষত না হয়, ততক্ষণ স্ত্রীকে প্রহার করা যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে।

নতুন আইনের অধীনে নারী ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে আরও এক দফা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ব্রিটিশ পত্রিকাটি লিখেছে, ‘আইনে নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের একটি পথ রাখা হলেও, তাদের গুরুতর শারীরিক ক্ষতির প্রমাণ দিতে বিচারকের সামনে ক্ষত প্রদর্শন করতে হবে, একই সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে আবৃত থাকতে হবে। এছাড়া আদালতে যেতে হলে স্বামী বা পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম)-এর সঙ্গেও থাকতে হবে। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত স্বামী হলেও তাকে নিয়ে যেতে হবে।

এটা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছে— নির্যাতনকারী স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে আদালতে হাজির হওয়ার সময় একজন নারী কতটা মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন। আবার সম্পূর্ণ আবৃত অবস্থায় কীভাবে তিনি বিচারকের সামনে নিজের ক্ষত দেখাবেন? আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্যাতনের প্রমাণ সংগ্রহ ও অপরাধ প্রমাণের বিষয়ে আফগান তালেবানের কোনো ধারণাই নেই বলে মনে হয়।

ধরা যাক, সব সামাজিক ও আইনি বাধা পেরিয়ে কোনো নারী স্বামীর বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতনের প্রমাণ দিতে সক্ষম হলেন—তবুও স্বামীর সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ দিনের কারাদণ্ড। অর্থাৎ, ১৫ দিন পর মুক্ত হয়ে তিনি আবারও প্রতিশোধ নিতে পারেন, যা কখনও কখনও প্রাণঘাতীও হতে পারে, কারণ অভিযোগ করাকে তিনি নিজের অসম্মান হিসেবে দেখতে পারেন।


পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশে নারীরা প্রায়ই বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু তালেবানের কঠোর অবস্থান সেই পথও বন্ধ করেছে।

দণ্ডবিধির ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী— যদি কোনো নারী স্বামীর অনুমতি ছাড়া বারবার বাবার বাড়ি বা আত্মীয়ের বাড়িতে যান এবং স্বামীর আহ্বান সত্ত্বেও ফিরে না আসেন, তবে ওই নারী এবং যেসব আত্মীয় তাকে স্বামীর বাড়িতে ফেরাতে বাধা দিয়েছেন—তাদের তিন মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর তথ্য অনুযায়ী, নারীদের স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, কাজ করা, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে বের হওয়া, জনসমক্ষে ত্বক প্রদর্শন, পুরুষ চিকিৎসকের সেবা নেওয়া, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বা প্রকাশ্যে কথা বলা—সবই নিষিদ্ধ।

জাতিসংঘ লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক সংস্থার মতে, আফগানিস্তানের প্রায় ৮০% তরুণী শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নয়। ‘ডি-ফ্যাক্টো মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় প্রশাসনে একজন নারীও নেই। তালেবান জারি করা ৮০টিরও বেশি ফরমান ও নির্দেশনা সরাসরি ও পদ্ধতিগতভাবে নারীর অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনকে লক্ষ্য করেছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর শিক্ষা, অধিকাংশ পেশা এবং পার্ক, জিম ও ক্রীড়াক্লাবসহ জনপরিসরে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন আফগান নারীদের দুর্দশার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, আফগান নারীরা ১৯১৯ সালে ভোটাধিকার পেয়েছিলেন, যা ১৯২৯ সালে প্রত্যাহার হয় এবং ১৯৬৪ সালে পুনরায় দেওয়া হয়। ১৯৫০, ১৯৬০, ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বড় শহরগুলোতে নারীরা সরকার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।


    শেয়ার করুন: