ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় চীনকেও পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকা মিত্রদেশগুলোকে ওয়াশিংটনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ইরানের তেল বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখা চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন বেসেন্ট। ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার, ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এসব মন্তব্য করেন।
বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের ওপর চলমান সামরিক ও নৌচাপকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ মাত্রার চাপ তৈরি করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ওয়াশিংটন এবার শুধু ইরানের সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করেই থামতে চায় না; ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও দেশগুলোকেও চাপের আওতায় আনার প্রস্তুতি রয়েছে।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চীন। ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের বড় অংশের প্রধান ক্রেতা চীন। ফলে তেহরানের তেল আয়ের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে হলে চীনা ক্রেতা, শিপিং নেটওয়ার্ক ও আর্থিক লেনদেনের ওপরও নজর দিতে হবে। বেসেন্ট তাই বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় কূটনৈতিক সংঘাতের সম্ভাবনা। চীন এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা যদি চীনা প্রতিষ্ঠান বা তেল ক্রেতাদেরও লক্ষ্য করে, তা হলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপরও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বেসেন্ট জানিয়েছেন, সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ইরানবিষয়ক নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। এর মাধ্যমে কোন খাত, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হবে, সেটিও পরিষ্কার হতে পারে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইরানের তেল রপ্তানি কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আগে থেকেই উত্তেজনা থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে তেল বিক্রি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়া। তেল রাজস্বে চাপ বাড়লে আমদানি ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং স্থানীয় মুদ্রার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও শিপিং ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়লে ইরানের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথ বজায় রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানও নিষেধাজ্ঞাকে ঘিরে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীনসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ কতটা সফল হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে ওয়াশিংটন কতটা কার্যকরভাবে এসব বিকল্প নেটওয়ার্কে চাপ সৃষ্টি করতে পারে তার ওপর।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করা কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে ছাড় না দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন।
ফলে বেসেন্টের নতুন ঘোষণাকে শুধু আরেক দফা নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ঘিরে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক জোট গড়ে তুলতে চাইছে—যেখানে মিত্রদেশগুলোর পাশাপাশি চীনের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদারকেও নিজেদের অবস্থানে আনতে হবে।
এখন মূল প্রশ্ন—চীন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দেবে, নাকি ইরানের সঙ্গে তেল ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে। সেই সিদ্ধান্তই ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির কার্যকারিতা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।






