‘প্লেগে’ গবেষণাগারকর্মীর মৃত্যু : রাশিয়ার কাছে তথ্য চেয়েছে ওয়াশিংটন

সংগৃহীত ছবি
রাশিয়ায় প্লেগের আতঙ্ক ঘিরে মস্কোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ২৮ বছর বয়সী এক গবেষণাগারকর্মীর মৃত্যুর পর নিউমোনিক প্লেগের সম্ভাব্য সংক্রমণ সম্পর্কে জানতে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চেয়েছে ওয়াশিংটন। তবে রাশিয়ার কাছ থেকে এখনো সীমিত তথ্য পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যেই আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা নেওয়া হাসপাতাল কোয়ারেন্টিন করা এবং প্রায় ২০০ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখার খবরও সামনে এসেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র সিএনএন বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ সরকারের কাছে অতিরিক্ত তথ্য চেয়েছি। তথ্য আদান-প্রদানের জন্য আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করছি।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার এর আগে বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার উচিত অবশ্যই বিশ্বের সঙ্গে আরও বেশি তথ্য ভাগাভাগি করা। হয়তো ঘটনাটি আমরা যতটা ভাবছি, তার চেয়েও বড়। আমরা জানি না। তবে এখনো আমাদের হাতে সীমিত তথ্য থাকায় এই মুহূর্তে অনুমান করা বেপরোয়া আচরণ হবে বলে আমি মনে করি।’
পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, গত শুক্রবার থেকেই মার্কিন কর্মকর্তারা রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। এরমধ্যে পররাষ্ট্র দপ্তরের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগও ছিল।
হোয়াইট হাউসের বাইরে মঙ্গলবার বিকালে সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ‘খুব শিগগিরই কথা বলার জন্য একটি ফোনকল নির্ধারিত’ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন সংস্থাগুলো ‘সম্ভবত আগামীকাল’ এ বিষয়ে আরও তথ্য জানাতে পারবে। তবে বুধবার ক্রেমলিন জানিয়েছে, রাশিয়ায় প্লেগের আতঙ্ক নিয়ে আলোচনা করতে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে কোনো ফোনালাপ নির্ধারিত হয়নি।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার কাছ থেকে সীমিত সহযোগিতা পেয়েছে। রাশিয়া থেকে যেটুকু তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, তা নিয়েও ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের মতে, রুশ সরকার পুরোপুরি খোলাখুলিভাবে তথ্য দিচ্ছে—এমনটা মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন না।
তবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও জানার আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। ভুলভাবে আটক করার আশঙ্কা এবং ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে রাশিয়ায় ভ্রমণের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সতর্ক করে আসছে।
এখনো যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি, তার একটি হলো—গত সপ্তাহে মারা যাওয়া ২৮ বছর বয়সী ওই গবেষণাগারকর্মী নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি না। এটি গুরুতর হলেও চিকিৎসাযোগ্য একটি সংক্রমণ। নাকি তিনি অন্য কোনো অজ্ঞাত সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটের কর্মীরা কলেরা, অ্যানথ্রাক্স ও ব্রুসেলোসিসসহ আরও বিভিন্ন বিপজ্জনক রোগ নিয়ে গবেষণা করেন বলে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে।
রোগটি কোনোভাবে পরিবর্তিত করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও মার্কিন কর্মকর্তারা তথ্য চেয়েছেন। গেইন অব ফাংশন নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়ায় কোনো জীবাণুর বৈশিষ্ট্য বা সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হতে পারে। এমন কিছু ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ কীভাবে পরিস্থিতির জবাব দেবে, তাতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ভেতরে ভেতরে প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ গভীর হচ্ছে। কারণ এখনো পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে রুশ সরকারের নেওয়া ব্যাপক পদক্ষেপও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শেলেখভস্কি জেলার মেয়রের বরাতে জানা গেছে, ওই গবেষণাগারকর্মী যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেটিও কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে।
একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ২০০ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বললেন, ‘আসলে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো আমরা অনেক কিছুই জানি না। তবে একটি বিষয়ে আমাদের অধিকাংশই নিশ্চিত—কোভিডের সময় চীনারা যেমন করেছিল, রাশিয়ারাও তেমন আচরণ করবে। তারা খোলাখুলিভাবে তথ্য দেবে না।’
এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, কয়েকটি ফেডারেল সংস্থা ‘নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’
একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প ডব্লিউএইচওর অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে মার্কিন সরকার সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে, ডব্লিউএইচওর প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস মঙ্গলবার বলেন, সংস্থাটির অনুরোধের জবাবে রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরকুৎস্ক অঞ্চলে সম্প্রতি প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
তিনি বলেন, রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি মহামারীবিষয়ক তদন্ত করা হয়েছে। সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। টেড্রোস জানান, ওই ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চঝুঁকির কোনো রোগজীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেনি রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
টেড্রোস বললেন, ‘অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত আরও একজন কর্মীকে’ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইছে ডব্লিউএইচও।
ডব্লিউএইচওর ওই অনুরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে বুধবার ক্রেমলিন পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে খারিজ করে দেয় এবং সাংবাদিকদের জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যেতে বলে।
সূত্র : সিএনএন





