যুদ্ধের চাপে ইরানে খাবারের দাম দ্বিগুণ, মধ্যবিত্তের সংসারেও নেমেছে সংকট

সংগৃহীত ছবি
ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণে ফাদায়িয়ান-ই ইসলাম সড়কের একটি বাজারে চালের ব্যাগ হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাম দেখছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী। দাম দেখে শেষ পর্যন্ত সেটি না কিনেই ফিরে যান তিনি। তাঁর কথায়, কয়েক দশক ধরে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করলেও এ বছর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একবার খাবার কিনতে গিয়ে দশবার ভাবতে হয়। তাঁর দাবি, প্রায় সব পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
ইরানে খাদ্যপণ্যের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সর্বশেষ হিসাবে। ইরানি ক্যালেন্ডারের তির মাসে- ২১ জুন থেকে ২০ জুলাই- এক বছর আগের তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১২৮ শতাংশ। ১০ টি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠীর মধ্যে আটটির মূল্যস্ফীতিই ১০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে তেল ও চর্বিজাতীয় পণ্যের দাম। এই শ্রেণিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ২৬১.৫ শতাংশে। দুধ, পনিরসহ দুগ্ধজাত পণ্যে ১৪৭.১ শতাংশ এবং লাল ও সাদা মাংস ও সংশ্লিষ্ট পণ্যে ১৪৫.২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। দরিদ্র মানুষের প্রধান খাদ্য রুটিও রেহাই পায়নি এই মূল্যস্ফীতির কোপ থেকে। রুটি ও শস্যের মূল্যস্ফীতি ১১৬.৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
দক্ষিণ তেহরানের একই এলাকায় ৪৫ বছরের বেসরকারি সংস্থার কর্মী মাজিয়ার বলছিলেন, আগে তাঁর পরিবারের খাবারের তালিকায় মাংস, উন্নত মানের ইরানি চাল ও ভালো মানের তেল নিয়মিত থাকত। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে এখন সেগুলো বাদ দিতে হয়েছে। বেতন হাতে পেলেই তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফেলেন। কারণ পরেরদিনই দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
উত্তর তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারেও একই চিত্র। ৬৩ বছরের মুদি দোকানি মাহমুদ জানান যে, প্রতিদিন দোকান খোলার সময় নতুন পাইকারি দাম দেখতে হচ্ছে। এমনকি তুলনামূলক সচ্ছল ক্রেতারাও এখন শুধু দাম জানতে দোকানে আসছেন। কেউ কেউ আবার বাকিতে পণ্য নেওয়ার অনুরোধ করছেন। তাঁর ভাষায়, ১৯৮০ থেকে ৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও বাজারে অন্তত ন্যূনতম কেনাকাটা চলত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি প্রায় স্থবির হয়ে গেছে ।
এই সংকট শুধু নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ৩৪ বছরের মরিয়ম জানান, দুই বছর আগেও তিনি ও তাঁর স্বামী বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও বাজারের ট্রলি ভরে কেনাকাটা করতেন। এখন প্রতিটি রিয়াল হিসাব করে খরচ করতে হচ্ছে তাঁদের। তাঁর কথায়, তেহরানে দারিদ্র্যসীমা ৯০০ মিলিয়ন রিয়ালে উঠে গেছে। দু’বছর আগেও তাঁরা উচ্চআয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে ছিলেন। এখন নিজেদেরই ‘সচ্ছল দরিদ্র’ মনে হচ্ছে।
ইরানের এই পরিস্থিতির পেছনে যুদ্ধপরিস্থিতি , নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সরবরাহ সংকট একসঙ্গে কাজ করছে। ২০২৬ সালের শুরুতেও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত তীব্র। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে উদ্ভিজ্জ তেলের দাম এক বছরে ৩৭৫ শতাংশ এবং তরল রান্নার তেলের দাম ৩০৮ শতাংশ বেড়েছিল। ফলে ইরানে মূল্যস্ফীতির চাপ এখন পৌঁছে গেছে এমন পরিবারগুলোর রান্নাঘরেও, যারা এতদিন নিজেদের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বলে ভাবত।
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন




