ইরানকে একঘরে করার ছক
ট্রাম্পের হিসাব ওলটাতে পারে চীন-রাশিয়া

তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা এই দুই শক্তিকে না থামাতে পারলে ইরানকে পুরোপুরি একঘরে করার ট্রাম্পের ছকই ধাক্কা খেতে পারে।
সমুদ্রপথে অবরোধ রয়েছে। তার সঙ্গে এ বার এমন নিষেধাজ্ঞার জাল ফেলতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাতে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার আগে দু’বার ভাবে বিশ্বের প্রতিটি দেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের গত মঙ্গলবারের হুঁশিয়ারি: তেহরানকে অর্থ, তেল বেচাকেনা কিংবা অন্য কোনও ভাবে ‘বাঁচার পথ’ করে দিলে সেই দেশকেও ভুগতে হবে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি। তার ভাষায়, ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হচ্ছে নজিরবিহীন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’, অর্থাৎ তেহরানকে কোণঠাসা করতে এক নির্ণায়ক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান। কিন্তু সেই পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় দুই প্রশ্নের নাম চীন ও রাশিয়া। বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা এই দুই শক্তিকে না থামাতে পারলে ইরানকে পুরোপুরি একঘরে করার ট্রাম্পের ছকই ধাক্কা খেতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার আরও এক ধাপ এগিয়ে জানিয়েছেন, ইরানের উপর ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ চাপাতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। তার কথায়, এক দিকে মার্কিন নৌ-অবরোধ, অন্য দিকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ–এই ‘দুই ঘায়ে’ তেহরানকে নত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার নতুন ব্যবস্থার বিস্তারিত জানানোর কথাও বলেছেন তিনি। তবে চীনকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে কি না, সরাসরি সেই প্রশ্নে বেসেন্ট প্রকাশ্যে উত্তর দিতে চাননি। বলেছেন, এ ধরনের আলোচনা ‘ব্যক্তিগত ভাবে’ হওয়াই ভাল।
ট্রাম্প অবশ্য বার্তায় কোনও রাখঢাক রাখেননি। তার হুঁশিয়ারি, যে কোনও দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি সংস্থা ইরানকে কোনও ধরনের ‘লাইফলাইন’ দিলে তাদেরও ‘বিরাট অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। তেল চোরাচালান, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান, জাহাজের নিবন্ধন কিংবা ভুয়া সংস্থার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথও বন্ধ করতে চান তিনি। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতিকে কার্যত শ্বাসরুদ্ধ করাই এখন ওয়াশিংটনের কৌশলের বড় অংশ।
চীনই সবচেয়ে বড় গেরো
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় সবচেয়ে কঠিন অঙ্কটি চীন। তথ্যবিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের হিসাবে, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে রফতানি করা ইরানি তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন। রয়টার্সের হিসাবে, সে বছর ইরান থেকে চীনের আমদানি ছিল দিনে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল। অর্থাৎ তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রফতানি আয়ের পথটি এখনও মূলত বেইজিংমুখী।
তার উপর ইরানি তেল কেনার সঙ্গে যুক্ত চীনের বহু শোধনাগার ছোট ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার উপর তাদের নির্ভরতাও তুলনামূলক কম। ফলে কোনও একটি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ফেললেই পুরো বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বড় চীনা ব্যাংকগুলোকে নিশানা করলে চাপ বাড়তে পারে, কিন্তু তাতে পাল্টা সংঘাতের ঝুঁকিও অনেক। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই চীনের সঙ্গে বিরাট বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়িত; গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজসহ বহু ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের উপর ওয়াশিংটনের নির্ভরতাও রয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ইউ জি-র মতে, ট্রাম্পের নতুন হুমকি চীন-ইরানের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন ঘটাবে না। বরং এমন সময় এই চাপ আসছে, যখন ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে এবং আগামী মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের পরিকল্পনাও রয়েছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতা ছাড়া একতরফা ভাবে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা ‘খুবই কঠিন’। অতীতে যে ধরনের কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে, তার পেছনে সাধারণত বহু দেশের সমন্বয় ছিল।
বেইজিংও ইতিমধ্যে তার অবস্থান জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, আরও নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধান করবে না; সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথেই সমাধান খোঁজা।
রাশিয়ার হিসাব আরও আলাদা
রাশিয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সমস্যা অন্য জায়গায়। চীনের তুলনায় ইরানের সঙ্গে মস্কোর বাণিজ্য ছোট হলেও, দুই দেশ বহু বছর ধরে এমন অর্থনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে কাজ করতে পারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২০ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পরমাণু শক্তি, ব্যাংকিং ও নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর কথা রয়েছে সেই চুক্তিতে। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে রুশ জ্বালানিমন্ত্রীর তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
আর মস্কোকে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখানোর ক্ষমতাও সীমিত। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। তাই ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের পথ তৈরির অভিজ্ঞতাও মস্কোর দীর্ঘদিনের।
বাণিজ্যের সঙ্গে রয়েছে সামরিক সম্পর্কও। আল জাজিরার প্রতিবেদনে একটি ইউরোপীয় সরকারি নথির বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কাস্পিয়ান সাগরপথে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি ইরানে পাঠিয়েছে রাশিয়া। যদিও এই নির্দিষ্ট দাবির বিষয়ে মস্কোর স্বাধীন নিশ্চিতকরণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ব্রিকসও তেহরানের ভরসা
পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে ব্রিকসকেও কাজে লাগাতে চাইছে ইরান। চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভারত, ব্রাজিলসহ একাধিক বড় অর্থনীতির এই জোটের সদস্য তেহরান। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি জানিয়েছেন, দেশটি ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দিতে চায়। নিজেদের মুদ্রায় ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে লেনদেন এবং দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় আর্থিক ব্যবস্থার কথাও ভাবছে তেহরান। যদিও ব্যাংকটিতে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়নি।
ইতিমধ্যে অবশ্য ইরানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ বন্ধ হয়েছে। দীর্ঘদিন তেহরানের আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু নিজেদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানের দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে তেহরানের বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে আবুধাবি। বিশ্লেষকদের মতে, অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর উপরও একই ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে পারে ওয়াশিংটন।
তবে সেই চাপের অভিঘাত ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রায় এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ৭৮ ডলার হয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত, সেখানে জাহাজ চলাচল এখনও মারাত্মক ভাবে ব্যাহত।
ইরান অবশ্য মার্কিন হুমকিকে উড়িয়ে দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞায় সরকার নয়, সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকেও হুমকিতে ফেলছে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্পের লক্ষ্য স্পষ্ট, ইরানের তেল বিক্রি, অর্থ লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিটি পথ একে একে বন্ধ করা। কিন্তু তেহরানও প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বসবাস করছে। তার উপর এ বার পাশে রয়েছে এমন দুই শক্তি, যাদের একটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, অন্যটি নিজেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
তাই প্রশ্নটি শুধু ইরানের উপর কতটা কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারবেন ট্রাম্প, তা নয়। আসল পরীক্ষা হলো, চীন ও রাশিয়াকে সেই নিষেধাজ্ঞা মানতে বাধ্য করতে পারবেন কি না। সেটি না পারলে তেহরানকে একঘরে করার জন্য ওয়াশিংটন যতই দরজা বন্ধ করুক, বেইজিং ও মস্কোর দিকে অন্তত দু’টি জানালা খোলাই থেকে যেতে পারে।






