ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি
‘গৃহযুদ্ধের’ আশঙ্কা থেকেই গেল

ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি স্বাক্ষর শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ দুই দেশের রাষ্ট্রদূতরা- রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ‘রূপরেখা চুক্তি’ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ ও চরম উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে নিজেদের একক বিজয় হিসেবে উদযাপন করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহল একে স্বাগত জানাচ্ছে। তবে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই চুক্তিকে ‘সার্বভৌমত্ব বিসর্জন’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।
হিজবুল্লাহর এই কঠোর অবস্থানের কারণে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিকে ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেম এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে ‘অকার্যকর ও অবৈধ’ বলে ঘোষণা করেছেন। একে তিনি লেবাননের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক, লজ্জাজনক এবং সার্বভৌমত্ব বিলিয়ে দেওয়ার শামিল বলে মন্তব্য করেন।
নাঈম কাসেমের দাবি, এই চুক্তি বাতিল করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ স্মারকটিতে লেবাননের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের কঠোর নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ আছে। একই সঙ্গে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমর্পণের প্রস্তাবকে ‘বিপজ্জনক ও সবকিছুর সীমা অতিক্রমকারী’ বিষয় বলে তিনি তীব্র নিন্দা জানান।
এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আগামী অনেক বছরের জন্য ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্বকে বৈধতা দিয়েছে লেবাননের বর্তমান সরকার। এর ফলে লেবাননের ভূমি ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কাসেম।
লেবানন সরকারকে নিজেদের ‘পাপের’ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইসরায়েলি দখলদারদের তাড়াতে যেকোনো সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত হিজবুল্লাহ। পাশাপাশি লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পেছনে ইরানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন তিনি।
বিপরীত চিত্র ইসরায়েলি শিবিরে। এই চুক্তি ঘিরে বইছে উৎসবের আমেজ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে ইসরায়েলের একচ্ছত্র জয় হিসেবে দেখছেন। কারণ চুক্তিতে ইসরায়েলের সব দাবিই মেনে নেওয়া হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননের মোট ভূখণ্ডের এক-পঞ্চমাংশ জুড়ে থাকা তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করতে হচ্ছে না। পাশাপাশি লেবাননের আকাশে ও ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের অবাধ বিচরণ এবং প্রয়োজনে যেকোনো সময় আক্রমণ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সেনা প্রত্যাহারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হয়নি।
ইসরায়েলি প্রশাসনের একাংশের মতে, এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি লেবানন সরকার ও হিজবুল্লাহকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদি লেবানন সরকারকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়, তবে ইসরায়েল নিজেই সেই যুদ্ধ চাপানোর দায় থেকে মুক্তি পাবে। ফলে লেবাননের ভেতরে গৃহযুদ্ধ শুরু হলেও ইসরায়েলের উদ্দেশ্য হাসিল হবে।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতারা এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, একে চমৎকার চুক্তি হিসেবেই দেখছেন।
এদিকে বৈশ্বিক পর্যায়ে এই চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্বনেতারা। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন একে স্বাগত জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি বলেছেন, লেবানন জ্বলতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে কখনো শান্তি আসবে না। এই মধ্যস্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ।
‘পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা। বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবিক সহায়তার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে ১০ কোটি ইউরো (১১৪ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করেছে,’ যোগ করেন তিনি।
একই সঙ্গে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসেফ রাজ্জিকে ফোন করে এই চুক্তির জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। সাফাদি আশা প্রকাশ করেন, এই চুক্তি লেবাননের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। জবাবে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্ডানের অবিচল সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এই চুক্তি মূলত কূটনীতির জয়। অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানের বড় বিজয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ক্রোয়েশিয়ার দুব্রোভনিকে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, রোম এই চুক্তি বাস্তবায়নে সব ধরনের কূটনৈতিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ম্যান্ডেটের পর একটি ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক মিশনে ইতালির সশস্ত্র বাহিনী অবদান রাখতে পারে। ইতালি এবং ফ্রান্স যৌথভাবে লেবাননের পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে যেকোনো আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক চুক্তি এবং সেখানে আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।





