ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও প্রাণের আশা
- ভূমিকম্পের প্রায় এক সপ্তাহ পরও লা গুয়াইরায় চলছে মরিয়া অনুসন্ধান
- মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৯৪৩, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা
- ১০,০০০ মৃতদেহের ব্যাগ সংগ্রহ করছে সরকার ও জাতিসংঘ
- সরকারের ভূমিকায় ক্ষোভ, উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে বাড়ছে সমালোচনা

সংগৃহীত ছবি
এক সময়ের ব্যস্ত উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরা এখন ধুলো, কংক্রিট, ভাঙা লোহার রড আর অপেক্ষার অন্য নাম। ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ খুঁজছেন সন্তানকে, কেউ মা-বাবাকে, কেউ বা স্বামী-স্ত্রীকে। আর সেই খোঁজে ভরসা এখন যন্ত্র নয়, মানুষের হাত। ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রায় এক সপ্তাহ পরেও ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরায় বহু মানুষ খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজে চলেছেন। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সরকারি খননযন্ত্র, কিন্তু তাতে জ্বালানি নেই।
মঙ্গলবারও লা গুয়াইরার বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলেছে। এক জায়গায় কংক্রিট ও বাঁকানো লোহার রডের স্তূপের পাশে একটি সরকারি খনন যন্ত্র দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেটি চলছিল না। কারণ যন্ত্রে দেওয়ার মতো পেট্রোল নেই।
ঘটনাটি আরও বিস্ময়কর এই কারণে যে, বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদের দেশগুলির অন্যতম ভেনেজুয়েলা। অথচ এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলির একটির পর বহু মানুষ জ্বালানির অভাবে হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপ খুঁড়তে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্রমশ সমালোচনা বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ডেটাস্ট্র্যাটেজিয়া সংস্থার প্রধান কারমেন বিয়াত্রিস ফার্নান্দেজ বলেন, মানুষ ক্ষুব্ধ। এই ট্র্যাজেডি আসলে আর-এক ট্র্যাজেডির প্রতিফলন। রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে শুধু দমন এবং প্রচারের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতাই ভেঙে পড়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো জানিয়েছেন, এই বিপর্যয় তাঁকে দেশে ফেরার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, আমাদের একসঙ্গে থাকতে হবে। এই সময় ভেনেজুয়েলাবাসীর পাশে থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সরকার তাদের ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতার পক্ষে সওয়াল করেছে। প্রাথমিক বিশৃঙ্খলার কথা স্বীকার করলেও শীর্ষ আইনপ্রণেতা হোর্হে রদ্রিগেস জানিয়েছেন, নতুন একটি কর্মসূচি চালু হয়েছে, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোও নাগরিকদের সরকারের উপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, নিখোঁজদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে আরও নিখুঁতভাবে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলছে। দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলির একটি লা গুয়াইরার বাতাসে এখন মৃত্যু আর ধ্বংসের গন্ধ। বহু জায়গায় দেখা যাচ্ছে, মানুষ কোদাল, গাঁইতি এবং খালি হাত দিয়ে বহুতল আবাসনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন।
ট্যাম্পা থেকে উড়ে আসা প্রকৌশলী হাসেল মেন্দোজা নিজের মা, বোন, ভগ্নিপতি এবং ভাগ্নেকে খুঁজছেন একটি নয়তলা আবাসনের ধ্বংসস্তূপে।
গত দু’টি রাত তিনি মাটিতেই কাটিয়েছেন। তার অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধারকাজ ভয়াবহভাবে ধীর হয়ে পড়েছে। তার দাবি, প্রতিবেশী আরাগুয়া প্রদেশ থেকে আসা সিভিল ডিফেন্স দলের কাছেও দ্রুত ধ্বংসস্তূপ সরানোর মতো যন্ত্রপাতি ছিল না।
এদিকে সরকারি মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রামিরেস জানান, অন্তত ১,৯৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের দিনের তুলনায় সংখ্যাটি প্রায় ২০০ বেশি। তবে আশঙ্কা, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা অনুমান করেছে, মৃতের সংখ্যা দশ হাজারেও পৌঁছতে পারে। সোমবার ভেনেজুয়েলায় জাতিসংঘের আবাসিক ও মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা জানান, আরও মৃত্যুর আশঙ্কায় সরকার এবং জাতিসংঘ যৌথভাবে ১০,০০০টি মৃতদেহ সংরক্ষণের ব্যাগ সংগ্রহ করেছে।
কিন্তু এত কিছুর পরেও অনেকেই আশা ছাড়তে রাজি নন। হাসেল মেন্দোজা বলেন, আমার পরিবার বেঁচে আছে- এখনও সেই সামান্য আশাটুকু আছে। মৃতদেহ না পাওয়া পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত হতে পারে না।
এই আশার পেছনে কারণও আছে। তিন দিনের তথাকথিত ‘সোনালি সময়সীমা’ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জায়গায় অলৌকিক উদ্ধারকাহিনি সামনে এসেছে। নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে সোমবার আসা ‘রিসোর্স রেসকিউ ইন্টারন্যাশনাল’-এর মার্কিন স্বেচ্ছাসেবক জ্যাক থর্প বলেন, অনেক সময় ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষ বেঁচে থাকার এক বিশেষ অবস্থায় চলে যান এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে সক্ষম হন। তার কথায়, আমরা জীবিতদেরও খুঁজছি, আবার মৃতদেরও। এখনও জীবিত মানুষ পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমি এখনও হাল ছাড়তে রাজি নই।
লা গুয়াইরার আর এক বাসিন্দা ডেইভিস রামোসের গল্প যেন এই বিপর্যয়ের প্রতীক। গত বুধবারের ভূমিকম্পে তার সাত বছরের মেয়ে ডার্লিং আন্তোনেলা এবং দুই বছরের মেয়ে দুলসে মারিয়া মারা গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেয়েরা তাদের দাদা-দাদীর সঙ্গে ছিল। তারাও ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন।
ভূমিকম্পের সময় রামোস শহরের বন্দরে কাজ করছিলেন। প্রথম কম্পনের আধ ঘণ্টার মধ্যে তিনি ধসে পড়া ভবনের সামনে পৌঁছে যান। তারপর থেকে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে খুঁড়ে চলেছেন ধ্বংসস্তূপ। তিনি বলেন, এখন কান্নার কথা ভাবার সময় নেই। আমার ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু কান্না একটা পাথরও সরাবে না। আমার এখন শক্তি আর ইচ্ছাশক্তি দরকার।
প্রথম দিন সরকার থেকে জেনারেটর পাঠিয়েছিল। কিছু ভারী যন্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্ধারকারীরা যখন বুঝতে পারেন যে ওই ভবনে জীবনের কোনও চিহ্ন নেই, তখন যন্ত্রগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে রামোস এবং অন্য স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘর ধরে ধরে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন। কখনও শাশুড়ির মোবাইল ফোন, কখনও সেলাইয়ের টেবিল, কখনও মেয়ের বিছানা মিলছে। কিন্তু মেয়েদের খোঁজ এখনও মেলেনি। তবু তিনি থামেননি। রামোস বলেন, আমরা বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। শুধু এতটুকুই চাই, যেন ওদের কাছে পৌঁছতে পারি এবং সম্মানের সঙ্গে শেষ বিদায় জানাতে পারি। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।
অনুবাদ: রুবাইয়া জেসমিন। কলকাতা প্রতিনিধি, আগামীর সময়





