কেন খামেনির জানাজায় প্রতিনিধি পাঠায়নি সৌদি?

খামেনির কফিনের পাশে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল- রয়টার্স
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির স্মরণে তেহরানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য এখনো কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি সৌদি আরব। শতাধিক দেশ এ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। সে তুলনায় রিয়াদের নীরবতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
মাত্র ১৪ মাস আগে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির জানাজায় অংশ নিতে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান নিজে তেহরান সফর করেছিলেন। বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া সৌদি-ইরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর সেটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ। তবে এরপর আর তেমন কোনো উচ্চপর্যায়ের সৌদি সফর দেখা যায়নি।
এবারের অনিশ্চয়তা এমন সময়ে দেখা দিল, যখন সৌদি-ইরান সম্পর্কের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। ১ জুলাই পর্যন্ত পোস্ট-গালফ সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট অনুযায়ী সৌদি আরবের আর্থিক দায় প্রায় ৩১ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে দোহায় চলমান পরোক্ষ আলোচনা খামেনির দাফন কর্মসূচি শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে, ২ জুলাই চীন সফর শেষে প্রিন্স ফয়সাল হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে চীন-সৌদি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। সময়সূচি অনুযায়ী তিনি চাইলে তেহরানেও যেতে পারতেন, কিন্তু তা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।
সৌদি আরব কেন নীরব?
এখন পর্যন্ত রয়টার্স, আলজাজিরা, ব্লুমবার্গ, আরব নিউজ বা আল আরাবিয়ার প্রকাশিত নিশ্চিত অতিথি তালিকায় সৌদি আরবের নাম নেই। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা রাজকীয় দরবারও খামেনির দাফন অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো বিবৃতি দেয়নি। এমনকি ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনির মৃত্যুর পরও রিয়াদের পক্ষ থেকে কোনো শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সৌদি আরবের সরকারি অবস্থানও ছিল সতর্ক। তারা মূলত সৌদি ভূখণ্ডে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিন্দা করেছে, কিন্তু খামেনিকে হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযানের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। ১ মার্চ সৌদি মন্ত্রিসভার একমাত্র সংশ্লিষ্ট বিবৃতিতে ‘ইরানের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আগ্রাসন ও সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানানো হয়, যা ইরানের পাল্টা হামলাকে উদ্দেশ্য করেই দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের তথ্য বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। ওয়াইনেট নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খামেনির বিরুদ্ধে হামলা চালাতে উৎসাহিত করেছিলেন। তবে একই সময়ে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে আশ্বস্ত করেছিলেন, সৌদি আকাশসীমা বা ভূখণ্ড এ অভিযানে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোপনে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তার রাষ্ট্রীয় জানাজায় যোগ দেওয়া সৌদি নেতৃত্বের জন্য বড় রাজনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যখন এই অনুষ্ঠানকে শুধু শোকানুষ্ঠান নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরছে।
২ জুলাই চীন সফর শেষে প্রিন্স ফয়সাল যে চীন-সৌদি যৌথ বিবৃতিতে সই করেন, তাতে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সফরের সময়সূচি এমন ছিল যে, চাইলে তিনি ৩ জুলাই তেহরানে যেতে পারতেন। কিন্তু সফরসূচিতে তেহরান অন্তর্ভুক্ত না থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, এ সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল।
রাইসির জানাজা বনাম বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সালের ১৯ মে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর তিন দিনের মধ্যেই প্রিন্স ফয়সাল তেহরান সফর করেন। সেই অনুষ্ঠানে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ এবং কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও অংশ নেন।
সেসময় বেইজিং-সমর্থিত সৌদি-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। দুই দেশ দূতাবাস পুনরায় চালু করেছিল, রাষ্ট্রদূত বিনিময় হয়েছিল এবং কোনো সরাসরি সংঘাতও ছিল না। ফলে ওই সফরে রিয়াদের রাজনৈতিক ঝুঁকি ছিল খুবই কম।
কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি তেলের স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং দেশটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯ মার্চ সৌদি আরব ইরানের সামরিক অ্যাটাশে, তার সহকারী এবং দূতাবাসের আরও তিন কর্মকর্তাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
ফলে যে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাইসির জানাজায় সৌদি প্রতিনিধি দল পাঠানো সম্ভব করেছিল, তা এখন আর নেই। বর্তমানে শুধু বেসামরিক কূটনৈতিক যোগাযোগ টিকে থাকলেও সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এ ছাড়া রাইসির মৃত্যুর সময় পোস্ট-গালফ সিকিউরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট কার্যকর ছিল না। এখন এই ব্যবস্থার আওতায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে প্রতিদিন প্রায় ৫৫ লাখ ডলার করে সৌদি আরবের আর্থিক দায় বাড়তে পারে। ফলে রিয়াদের সামনে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে— একদিকে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে জরুরি, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থার বাস্তবায়নকারী ইরানি নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানো তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।




