কলকাতায় হোটেলে আগুন
‘সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখি দাউদাউ আগুন’

সংগৃহীত ছবি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে আগুন লেগে বাংলাদেশিসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মধ্যরাতে সবাই যখন গভীর ঘুমে, তখনই ঘটে এই অগ্নিকাণ্ড। বেঁচে ফেরা অতিথিদের ভাষ্যে উঠে এসেছে ঘটনার ভয়াবহতা। তাদের অভিযোগ, হোটেলে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না, সিঁড়ি ছিল অনেক সরু, কর্মীরাও ছিলেন উদাসীন।
অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলটির চতুর্থ তলায় ঘুমাচ্ছিলেন মুহাম্মদ আমিরুল ও ইজাজ আহমেদ। তাদের ভাষ্য, হঠাৎ ধোঁয়ায় ঘুম ভাঙে। জানালার কাছে গিয়ে দেখেন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে চারপাশ। আগুন লেগেছিল তিনতলায়। চতুর্থ তলায় ছিল শুধু ধোঁয়া। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পাশের ঘরের দরজায় ধাক্কা দেন। তারাও বাকিদের জাগানোর চেষ্টা করেন।
হোটেলের কাউকে ডাকাডাকি করেও না পাওয়ার অভিযোগ করেন তারা। তারা বলছিলেন, ভবনে লিফট থাকলেও সেটি বন্ধ ছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে যখন দাউদাউ করে আগুন দেখেন, তখন মনে হয়েছিল, আর ঘরে ফেরা হবে না। তারপর দমকল ও পুলিশ কর্মীরা এসে তাদের উদ্ধার করেন।
কলকাতার দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনকে আরেক ব্যক্তি বলছিলেন, ‘মৃত্যুকে যেন কাছ থেকে দেখলাম। প্রাণ বাঁচাতে সবাই নিজের মতো চেষ্টা করছিল। অনেকেই ঝাঁপ দেবেন ভেবেছেন। ওই মুহূর্তে প্রাণ বাঁচানো ছাড়া আর কিছু ভাবার মতো অবস্থায় ছিলাম না। একজন ধোঁয়া দেখে জানালা থেকে ঝাঁপ দিয়েছে।’
হোটেলটিতে উঠেছিলেন ঢাকার বাসিন্দা জামাল এবং তার ভাই। তাদের কক্ষ ছিল হোটেলের চতুর্থ তলায়। মধ্যরাতে চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙে তাদের। শুনতে পান নিচ থেকে সবাই বলছে, ‘আগুন লেগেছে’।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকাকে জামাল বলছিলেন, ‘নিচে নামতে পারছিলাম না। কোনোক্রমে ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ভবনের ছাদে উঠে যাই। আমরা সেখানে ২০ থেকে ২৫ জন ছিলাম। সবাই চলে যাই ছাদে থাকা পানির ট্যাংকের কাছে। বুঝতে পারছিলাম না, কোনদিক থেকে আগুন আসতে পারে। আমরা ঠিক করেছিলাম— আগুনের শিখা দেখতে পেলেই ট্যাংক থেকে পানি নিয়ে নেভানোর চেষ্টা করব।’
ঢাকার আরেক বাসিন্দা নাজমুল সরকার বলছিলেন, ‘একটা সময় মনে হয়েছিল মরেই যাব। অক্সিজেনের অভাব ছিল। শ্বাস নিতে পারছিলাম না।’
তার কথায়, ‘হোটেলের কর্মচারীরা বারবার বলছিলেন উপরে উঠুন। কিন্তু উপরে ওঠার রাস্তা এতটাই সরু যে একজন করেই উঠতে পারেন। লোহার সিঁড়ি। কোথা দিয়ে পালাব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। নিচে নামার কোনো পরিস্থিতি ছিল না। ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল চারদিক। এক হাত দূরের কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে কোনো রকমে উপরে উঠি।’
অতিথিদের অভিযোগ, হোটেলে ছিল না অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। আগুন লাগার পরেও উদাসীন ছিলেন হোটেলের কর্মীরা।
মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে যাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশিরাও।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বিস্ফোরণের কারণে আগুন লেগে থাকতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের তথ্য মতে, ওই হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে মৃত সবাই বাংলাদেশি। তারা চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। তবে এনডিটিভি বলছে, মৃতদের একজন ভারতীয় নাগরিক।
তবে ভিন্ন তথ্য জানাচ্ছে ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃতদের মধ্যে বাংলাদেশ, মেঘালয় এবং পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের মানুষ ছিলেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত তিনজন বাংলাদেশি।
পুলিশের এক কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, ঘন ধোঁয়ার কারণে কঠিন হয়ে পড়েছিল দমকলকর্মীদের সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলাগুলোয় পৌঁছানো। এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু বিষয়টি নিশ্চিত হলেও, সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি রোগীদের অন্যতম গন্তব্যস্থল ভারত। কলকাতাসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে চিকিৎসা নেন এসব রোগী। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভিসা জটিলতা ও কড়াকড়ির কারণে ভারতে যাওয়া কিছুটা কমেছিল।






