জেলেদের চোখে সমুদ্রের অজানা জীবন: ভারতের প্রথম সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের নথি

জেলেদের অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক নথি।
সমুদ্রের ঢেউ দেখে মাছের গতিপথ বোঝেন তারা। কোন পাথরের নিচে মাছের ঝাঁক, কোথায় প্রবালপ্রাচীর, কোন জলসীমায় ডুব দিয়ে সাবধানে এগোতে হবে এ সবকিছু তাদের নখদর্পনে। এতদিন সেই জ্ঞান ছিল মূলত জীবিকার হাতিয়ার। এবার সেই অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক নথি। ভারতের কেরল উপকূলে জেলেদের সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রের তলদেশের প্রাণজগতের মানচিত্র তৈরি করছেন একদল গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবী।
‘নেচার ইন্ডিয়া'য় ১৪ আগস্ট প্রকাশিত এক রিপোর্টে এই উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। কেরলের উপকূলীয় গ্রাম ভিঝিঞ্জামকে কেন্দ্র করে কাজটি চালাচ্ছে ‘ফ্রেন্ডস অব মেরিন লাইফ’ বা এফএমএল নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট পানিপিল্লার নেতৃত্বে গত এক দশকে আরব সাগরের উপকূলে ডুব দিয়ে সামুদ্রিক জীবনের নানান তথ্য সংগ্রহ করেছেন
স্থানীয় জেলেরা। এই অনুসন্ধানের পরিসরও কম নয়। নথিতে এখন পর্যন্ত ৭০টি মাছের প্রজাতির পাশাপাশি ম্যান্টিস শ্রিম্প থেকে শুরু করে সামুদ্রিক শসার মতো বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর তথ্য রয়েছে। দলটি কেরল উপকূলের নয়টি জাহাজডুবির স্থান, অগভীর জলের ১৪ টি প্রবালপ্রাচীর, সমুদ্রের আরও গভীরে থাকা ছয়টি প্রবালপ্রাচীর, একটি শৈবাল সমৃদ্ধ আবাসস্থল এবং সাতটি কৃত্রিম প্রবালের এলাকার তথ্যও নথিবদ্ধ করেছে।
কাজটির পেছনে রয়েছে জেলেদের দীর্ঘদিনের স্থানীয় জ্ঞান। যেমন, জেলে সামকুট্টি মুলাভারাক্কাল্লু এলাকায় প্রবালপ্রাচীর খুঁজে বের করতে পানির নিচে ঢেউ ও পাথরে আছড়ে পড়া স্রোতের শব্দ শুনে অবস্থান নির্ণয় করেন। পানিপিল্লার ভাষায়, তার এই পদ্ধতি যেন মানুষের তৈরি জিপিএস।
এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হল, এটি ভারতের প্রথম বেসরকারিভাবে তৈরি জনঅংশগ্রহণ ভিত্তিক সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের নথি। ২০২৬ সালের জুনে ১২ জন জেলেকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এর আগে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে কেরল রাজ্য জীববৈচিত্র্য পর্ষদের একটি প্রকল্পে পানিপিল্লা যুক্ত ছিলেন। তবে সেখানে জেলেদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তিনি নিজেই সম্প্রদায়ভিত্তিক একটি নথি তৈরির উদ্যোগ নেন।
ভারতের অন্য প্রান্তেও এমন কাজ চলছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কার নিকোবর দ্বীপে স্থানীয় আদিবাসী জেলেদের সহায়তায় সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননস্থল নথিবদ্ধ করা হচ্ছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া সেই প্রকল্পে ১৬৮ জন আদিবাসী জেলের সঙ্গে কথা বলে এমন একটি অলিভ রিডলি কচ্ছপের ডিম পাড়ার সৈকতের সন্ধান পাওয়া যায়, যা সরকারি উপকূলীয় মানচিত্রে ছিল না। স্থানীয় রীতি ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের সংঘাত মেটাতেও গবেষকদের সমঝোতার পথে যেতে হয়েছে। সেই উদ্যোগে এ পর্যন্ত ১,০০০-এর বেশি কচ্ছপশাবক সমুদ্রে ফিরেছে।
তবে জেলেদের সংগৃহীত তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্নও রয়েছে। কেরলের সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী দিব্যা বিশ্বম্ভরন বলেন যে, প্রজাতি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা জরুরি। আবার কেরল বিশ্ববিদ্যালয়ের জলজ জীব বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এ বিজু কুমারের মতে, দেশজুড়ে বিশেষজ্ঞের ঘাটতিই এ ধরনের উদ্যোগের বড় বাধা। তারপরও আশাবাদী বিজ্ঞানী সালমা জেসমিন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রবালপ্রাচীর নিয়ে কাজ করা এই প্রাক্তন বিজ্ঞানীর কাছে পরিবর্তনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভিঝিঞ্জামের জেলেরা একসময় পর্যটকদের কাছে প্রবালের টুকরো বিক্রি করতেন, তাঁরাই এখন সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের নথিকার ও রক্ষক।




