প্রতীক নিয়ে থানায় অভিযোগ, ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ নিয়েও মুখোমুখি মমতা-ঋতব্রত

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। কোলাজ : আগামীর সময়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন শুধু রাজনৈতিক বিবাদে সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে গেছে থানার দরজা পর্যন্ত। দলীয় প্রতীক, সংগঠনের নাম ব্যবহার এবং চেয়ারম্যান পদ ঘোষণা নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-ঘনিষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে কলকাতার একাধিক থানায় এবং সাইবার অপরাধ দফতরে অভিযোগ করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবির।
পাশাপাশি ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস পালন নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে প্রকাশ্য টানাপোড়েন।
কালীঘাট শিবিরের অভিযোগ, দলীয় সাংগঠনিক নিয়ম না মেনে নিজেদের উদ্যোগে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং ঘাসফুল প্রতীক ব্যবহার করাও বেআইনি। এই অভিযোগে নিউ টাউন, প্রগতি ময়দান, কালীঘাট থানা এবং সাইবার অপরাধ শাখায় পৃথক অভিযোগ করা হয়েছে।
সূত্রের দাবি, সম্প্রতি নিউটাউনের একটি বৈঠক থেকে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয় ঋতব্রত শিবিরের পক্ষ থেকে। পরে তপসিয়াতেও ঋতব্রতপন্থীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই দুই কর্মসূচিকেই অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে কালীঘাট শিবির।
তাদের বক্তব্য, ২০২২ সালের সাংগঠনিক সম্মেলনে প্রতিনিধিরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের আজীবন চেয়ারপার্সন হিসেবে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই অবস্থায় তার অনুপস্থিতিতে নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা গঠনতন্ত্রবিরোধী।
অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-ঘনিষ্ঠ নেতাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, দলীয় প্রতীক ও সাংগঠনিক বৈধতার প্রশ্ন ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের নজরে আনা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিশনই নেবে। বিদ্রোহী শিবির নিজেদেরই আসল তৃণমূল বলে দাবি করছে। গত কয়েক সপ্তাহে তারা একাধিক বৈঠক করেছে এবং তাদের দাবি, বিধানসভার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য তাদের পাশে রয়েছেন।
প্রতীক বিতর্কের আবহেই সামনে এসেছে ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস নিয়ে বিবাদও। ধর্মতলায় ঐতিহ্যবাহী কর্মসূচি পালনের অনুমতি চেয়ে কলকাতা পুলিশের কাছে আবেদন করেছে দুই পক্ষই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের আবেদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ কমিশনারের কাছে পৃথক চিঠি জমা দেয় ঋতব্রতপন্থীরা।
শনিবার তপসিয়ার বৈঠকের পর ঋতব্রত শিবিরের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান বলেছেন, আমরা শহিদ পরিবারগুলোকে সামনে রেখে ২১ জুলাই পালন করতে চাই। এতদিন নায়ক-নায়িকাদের ভিড়ে প্রকৃত শহিদ পরিবারগুলো আড়ালে চলে যেত। এবার তাদের প্রকৃত সম্মান জানানো হবে।
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি মমতাপন্থী শিবিরকে কটাক্ষ করেন। তার আরও প্রশ্ন, যারা বিধানসভায় পরিষদীয় দলই গঠন করতে পারে না, তারা আবার কীভাবে ২১ জুলাই পালন করবে?
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই জানিয়েছেন, যত বাধাই আসুক, ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করা হবে। কারণ ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বাংলার রাজনীতিতে এই দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সেই বছর ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার দাবিতে যুব কংগ্রেসের আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ১৩ জন কর্মীর মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই দিনটিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেস।
এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। শুধু দুই তৃণমূল শিবিরই নয়, প্রদেশ কংগ্রেসও শহিদ মিনারে আলাদা কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৬ সালের ২১ জুলাই হয়তো শুধু স্মরণসভা নয়, বরং বাংলার বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম বড় মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বর্তমানে লড়াইটা আর শুধুমাত্র নেতৃত্বের নয়; এটি প্রতীক, সংগঠন, উত্তরাধিকার এবং জনসমর্থনের লড়াই। দলীয় প্রতীকের বৈধতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এবং থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগগুলির ভবিষ্যৎ অগ্রগতি আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।




