পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক আইন
ক্ষমতায় বসেই গরু জবাইয়ে কড়াকড়ি বিজেপির
- দেশভাগের পর প্রথম মুসলিমবিদ্বেষী নীতি
- সামনে কোরবানির ঈদ। মাংস ব্যবসায়ী ও সংখ্যালঘু মহলে উদ্বেগ
- ছাগল, খাসি বা পাঁঠা জবাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো নির্দেশনা রাখা হয়নি

সংগৃহীত ছবি
রাজ্য ক্ষমতায় বসেই পশু জবাই নিয়ে কঠোর অবস্থানে গেল পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। গত বুধবার রাতেই এ বিষয়ে কড়া বিজ্ঞপ্তি জারি করে সদ্য নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন। নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে— গরু, বলদ, গাভী, বাছুর এবং মাদি ও পুরুষ মহিষসহ কোনো পশুই নির্দিষ্ট সনদ ছাড়া জবাই করা যাবে না। আবার এ সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বেঁধে দেওয়া হয়েছে কঠিন নিয়ম। সামনেই কোরবানির ঈদ। তার আগেই ‘গো হত্যা’ বন্ধে বিজেপির ঐতিহাসিক এ মুসলিমবিদ্বেষী নীতিতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যের সংখ্যালঘু মহলে।
একই সঙ্গে প্রশাসনের অনুমোদিত কসাইখানা ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাই করা যাবে না। সরকারি নির্দেশ অমান্য করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা এক হাজার রুপি জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে প্রথম এমন আইন এনেছে বিজেপি সরকার। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘শুধু ১৪ বছরের বেশি বয়সী পশু, যেটি প্রজনন বা কাজের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে কিংবা রোগ বা আঘাতের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে গেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেই দেওয়া হবে এই সনদ। পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং সরকারি পশু চিকিৎসক যৌথভাবে এই সনদ দেবেন। পশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা, বার্ধক্য বা গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টি খতিয়ে দেখেই দেওয়া হবে সেই অনুমতি। কেউ সনদ না পেলে ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন। নতুন আইনে ছাগল, খাসি বা পাঁঠা জবাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো নির্দেশনা রাখা হয়নি।
রাজ্য সরকারের দাবি, আদালতের নির্দেশ এবং বিদ্যমান আইন মেনেই এই পদক্ষেপ। তবে এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে মাংস ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত প্রশাসনিক কড়াকড়ির ফলে সমস্যায় পড়বেন বহু ছোট ব্যবসায়ী। বিশেষ করে কোরবানির সময় সাধারণ মুসলিম পরিবারগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ ও আতঙ্ক তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অতীতে ঘটে যাওয়া গো-রক্ষা সংক্রান্ত সহিংস ঘটনার প্রসঙ্গও নতুন করে সামনে আসছে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে গো-রক্ষার নামে বিজেপির বিরুদ্ধে গণপিটুনি, হামলা ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ২০১৪ সালের পর উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ডসহ একাধিক রাজ্যে গরু পরিবহন বা গোমাংস রাখার সন্দেহে সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগ রয়েছে ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং তথাকথিত গো-রক্ষা রাজনীতির।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এ ধরনের কড়াকড়ি বা উত্তেজনা শুধু সামাজিক বিভাজনই বাড়ায় না, এর প্রভাব পড়ে পশু ব্যবসা, চামড়া শিল্প ও খাদ্য ব্যবস্থার ওপরও। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেকের আশঙ্কা, ঈদের আগে এ ধরনের পরিবেশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।




